দ্য ওয়াল ব্যুরো: তেত্রিশ বছর আগের ঘটনা। ৮৭ সালে দুর্গা পুজোর মাস দুয়েক আগে মুক্তি পেয়েছিল অপর্ণা সেন-ভিক্টর ব্যানার্জি অভিনীত বাংলা ছায়াছবি একান্ত আপন। স্বপন চক্রবর্তীর কথায় ও রাহুল দেব বর্মণের সুরে সে ছবির প্রতিটি গানই তখন হিট। তারই মধ্যে একটি গান অনন্য স্থান করে নিয়েছিল পুজোর মরশুমে.. “না না কাছে এসো না মায়াবী এই রাতে..।” দ্বৈত কন্ঠে গাওয়া সে গান গেয়েছিলেন দুই অবাঙালি শিল্পী। একজন আশা ভোঁসলে, যিনি ততদিনে বাঙালির একান্ত আপন হয়ে গিয়েছেন একাধিক হিট গানের দৌলতে। অন্য শিল্পী বাংলা গানে সেই প্রথম- শ্রীপতি পণ্ডিতারাধ্যুলা বালসুব্রহ্মমণ্যম। দক্ষিণের এই গায়কের গায়কি সত্যিই যেন মায়াবী।
https://youtu.be/R14ocdFNCiU
এসপি বালসুব্রহ্মণ্যমের সঙ্গে সেই প্রথম অবশ্য পরিচয় নয় বাঙালির। দক্ষিণের ছবিতে এসপি-র তারও অনেক আগে থেকে নাম ডাক ছিল। কিন্তু আসমুগ্র হিমাচল তাঁকে চিনেছিল বলিউডের সেই কিম্বদন্তী সিনেমার গান থেকে—৮১ সালে মুক্তি পাওয়া সুপার ডুপার হিট ছবি ‘এক দুজে কেলিয়ে’। তারও তিন বছর আগে পরিচালক কে বালচন্দ্র তেলুগুতে একটি ছবি বানিয়েছিলেন। নাম ‘মারো চরিত্র’। এক দুজে কে লিয়ে সেই ছবিরই রিমেক। আনন্দ বক্সীর কথায় ও লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারিলালের সুরে সেই ছবির একটি বাদ দিয়ে সব কটি গানই গেয়েছিলেন এসপি। তেরে মেরে বিচ মে ক্যায়সা হ্যায় ইয়ে বন্ধন, হাম বানে তুম বানে এক দুজে কে লিয়ে, মেরে জীবন সাথী প্যায়ার কিয়ে যা... আন্দোলিত করে দিয়েছিল ভূভারত!
করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত হয়েছিলেন বালসুব্রহ্মণ্যম। আজ শুক্রবার দুপুরে চেন্নাইয়ের এমজিআর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।
বস্তুত গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে কিংবদন্তী এই গায়কের জীবন ছিল রূপকথার মতোই। তাঁর কণ্ঠ সমসাময়িক বলিউডের অন্য গায়কদের তুলনায় ছিল একেবারেই অনন্য। অদ্ভূত মাদকতা ছিল গলায়। শুধু তামিল, তেলুগু বা বাংলায় নয়, আরও বহু ভাষায় গান গেয়েছেন এসপিভি। তামিল, তেলুগু, কন্নড় ও হিন্দি ছবিতে গানের জন্য ৬ বার সেরা প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসাবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। এমনকি সব থেকে বেশি গান রেকর্ড করার গিনেজ রেকর্ডও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। চল্লিশ হাজারেরও বেশি গান গত পঞ্চাশ বছরে রেকর্ড করেছেন তিনি।
তেলুগু ছবি দিয়েই চলচ্চিত্র জগতে যাত্রা শুরু হয়েছিল এসপি-র। ৬৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল তেলুগু ছবি ‘শ্রী শ্রী শ্রী মর্যাদা রামান্না’। তার পর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ষাটের দশকের শেষ দিক থেকেই তামিল, কন্নড় ও মালায়ালাম ভাষার একের পর এক ছবিতে সুপারহিট গান গেয়েছেন এসপি। তবে দক্ষিণী ফিল্মের দুনিয়ায় এসপি উচ্চতা পেয়েছিলেন আরও কিছুটা পরে। ১৯৮০ সালে মুক্তি পেয়েছিল তেলুগু ছবি শঙ্করভরনম। কে বিশ্বনাথ পরিচালিত সেই অবিস্মরণীয় ছবিতে গান গেয়েই প্রথম জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন এসপি।
https://youtu.be/Kxd6po6wL4w
দক্ষিণের চলচ্চিত্র জগতের অনেকেই বলেন, এর পরের দশ বছর ছিল এসপি যুগ! সঙ্গীত পরিচালক ইলাইয়ারাজার সুরে এসপি ও এস জানকি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তেলুগু, তামিল, কন্নড় ও মালায়ালাম সিনেমায়। সাগর সঙ্গম, স্বাথী মুথায়ম, রুদ্রবীণা ছবিতে তাঁর গান দক্ষিণের মানুষের মনে তাঁকে চিরস্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।
হিন্দি ছবিতে কমল হাসানের কন্ঠে এক দুজে কে লিয়ে ছবিতে প্লে-ব্যাক করে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন এসপি। গোটা দেশের মানুষ চিনেছিল এক নতুন কন্ঠশিল্পীকে। পরে কমল হাসানের কন্ঠেই ফের সাগর ছবিতে প্লে ব্যাক করেছিলেন এসপি বালসুব্রহ্মণ্যম। ফের সুপারহিট—‘সচ মেরে ইয়ার হ্যায়, বাস ওহি প্যায়ার হ্যায়, জিসকে বদলে মে না কৌই তো পেয়ার দে..’। হিট হয়েছিল আশা ভোঁসলের সঙ্গে ডুয়েট ‘ও মারিয়া’ গানটিও।
বলা যেতে পারে হিন্দি ছবিতে সে ছিল তাঁর প্রথম ইনিংস। পরের ইনিংস শুরু হয় আশির দশকের শেষে। এ বার সলমন খানের কন্ঠে। ৮৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল রাজশ্রী প্রোডাকশনসের সুপার ডুপারহিট ছবি সলমন খান-ভাগ্যশ্রী অভিনীত ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’। এসপি ও লতা মঙ্গেশকরের দ্বৈত কন্ঠে গাওয়া সেই ছবির গান মাতিয়ে দিয়েছিল সবাইকে। রেকর্ড ক্যাসেট বিক্রি করেছিল এইচএমভি। সম্ভবত এখনও পর্যন্ত হিন্দি ছবির অ্যালবামের এতো ক্যাসেট আর বিক্রি হয়নি।
ম্যায়নে পেয়ার কিয়া-র সেই সাফল্য তথা সলমন-এসপি-র সেই রসায়ন যেন ছিল রাজেশ খান্না-কিশোর কুমারের মতো। সলমনের ছবি মানেই এসপি-র গান। পাত্থর কে ফুল, লাভ, সাজন, হাম আপকে হ্যায় কৌন—এর পর থেকে সলমনের অভিনীত প্রায় সব ছবিতেই প্লে ব্যাক করেছিলেন এসপি। এ আর রহমানের নির্দেশনায় রোজা ছবিতে তিনটি গান গেয়েছিলেন এসপি। রোজা ছবিতেও তাঁর গাওয়া প্রতিটি গানই ছিল হিট। পরে নব্বইয়ের দশকে এ আর রহমানের সুরে আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে প্লে ব্যাক করেছিলেন এসপি।
https://youtu.be/WTzPNj4UCnI
শুধু প্লে ব্যাক করাই নয়, রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ‘গান্ধী’র তেলুগু সংস্করণে বেন কিঙ্গসলের কন্ঠে ডাবিং করেছিলেন এসপি। পরবর্তী কালে কমল হাসান, রজনীকান্ত, সলমন খানের অনেক তেলুগু ছবিতে ডাব করেছেন এসপি। তা ছাড়া চলচ্চিত্র জগতে অনন্য সব কীর্তিও স্থাপন করেছিলেন এসপি। কন্নড় ভাষায় ১২ ঘন্টায় ২১ টি গান রেকর্ড করেছিলেন তিনি। পরে একদিনে ১৬ টি হিন্দি গান ও ১৯ টি তামিল গান রেকর্ড করেছিলেন এসপি। ২০০১ এবং ২০১১ সালে ভারত সরকার তাঁকে যথাক্রমে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। তবে দক্ষিণে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘পাদুম নীলা’ নামে। যার অর্থ গান গাওয়া চাঁদ। রজনীকান্তের কথায়, এসপি বালসুব্রহ্মণ্যমের মৃত্যুতে ভারতীয় সঙ্গীতজগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হল।