
শেষ আপডেট: 5 April 2023 14:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সদ্য শেষ হয়েছে রামনবমী (Ramnavami)। কিন্তু রামনবমীকে কেন্দ্র করে ঘনিয়ে ওঠা সংঘাতের আবহ এখনও স্তিমিত হয়নি। বৃহস্পতিবার হনুমান জয়ন্তী (Hanuman Jayanti)। স্বাভাবিক ভাবেই আশঙ্কা ঘনিয়েছে, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ফের কোথাও আগুন জ্বলবে না তো?
গত কয়েক বছরে বাংলার তথা গোটা দেশেরই রাজনৈতিক পরিস্থিতির আমূল বদল হয়েছে। রাম নবমীর মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনেক বেশি স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে ছবি যখন বদলেছে, তখন সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব বেড়েছে, সেই পরিস্থিতিতে তাঁদের আচরণ কেমন হবে, তা নিয়ে। প্ররোচণায় বা ফাঁদে পা না দিয়ে শান্তি বজায় রাখাটাও সাধারণ মানুষের সামনেও চ্যালেঞ্জ।

অবশ্য সাধারণ মানুষের দায়িত্বের কথাটা মেনে নিলেও, অশান্তির দায় সাধারণের উপর চাপাতে নারাজ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, "সাধারণ মানুষ চিরকালই ভয় পায়, তারা কখনওই অশান্তি চায় না। অশান্তির পিছনে সমাজবিরোধী কিছু মানুষেরই হাত থাকে, আর সেই সব সমাজবিরোধীদের লাগাম ধরা থাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক পার্টির হাতে। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে সেই সব সমাজবিরোধীদের কাজে লাগায় দলগুলি। এটা পুরোটাই রাজনৈতিক গেম, এতে সাধারণ মানুষের কোনও রকম ইনভলভমেন্ট কোনওদিনই নেই। সাধারণ মানুষ সবসময়ই ভিকটিম। তাদের ঘাড়ে বন্দুক রাখা অনুচিত।"
সাম্প্রতিক অশান্তির আবহে শীর্ষেন্দুবাবু আরও বলেন, "চারপাশে যা হচ্ছে, তা আতঙ্কজনক এবং হ্যাঁ, আমি ভয় পাচ্ছি। এই সব উৎসবের উপলক্ষ কী, তা আজকাল বুঝতে পারি না। বুঝতে পারি না, কেন এইসব উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে যায় চারপাশে। রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তী বা মহরম— যাই পালন হোক, তা তো শান্তিপূর্ণভাবে হওয়ার কথা, কারণ এ সবই ধর্মীয় উৎসব। ধর্মপালনে অশান্তি কেন, তা আমার কাছে রহস্য!"

অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী মীর আবার জোর গলায় সাধারণের শান্তিরক্ষার চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করছেন। তিনি বলছেন, "আমার মনে হয়, আমাদের রাজ্যের শুধু নয়, আমাদের দেশের মানুষ যথেষ্ট বুদ্ধিমান, তাঁরা জানেন কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল, কোনটা অন্যায়। সুতরাং, বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা বারবারই করে যান, কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে। কিছু মানুষ বিপথে চলে গেলেও, বেশিরভাগ মানুষ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন। যতদিন এই সংখ্যাটা বেশি থাকবে, ততদিন এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাটা কোনও রাজ্যের পক্ষে কঠিন নয়।"
তবে মীর মনে করেন, এই দায়িত্বের বা চ্যালেঞ্জের প্রশ্ন কেবল বাংলার অশান্তির পরিপ্রেক্ষিতে তোলা ঠিক নয়। তাঁর কথায়, "আমার মনে হয় এটা শুধু বাংলার সমস্যা নয়, গোটা দেশেরই সমস্যা। এবং এর একটা দিক হল, যখনই এরকম অশান্তি বা বিভেদ হয়েছে মানুষ তখনই আরও বেশি করে একজোট হয়েছে। আমাদের দেশে ধর্মের নামে উস্কানির একটা প্রচলন থাকলেও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ শান্তির সঙ্গেই নিজেদের ধর্ম পালন করতে চান। দেশের সার্বভৌম এবং একতা মাথায় রেখেই উৎসব পালন করতে চান। একথা খাতায়-কলমে যেমন লেখা আছে, তেমনই মানুষের মনেও লেখা আছে, ধর্ম যার যার, উৎসব কিন্তু সবার। আমরা কেউ বিভেদ সৃষ্টি করতে চাই না। যাঁরা এটা করে থাকেন বা করিয়ে থাকেন, তাঁরা নিজেদের স্বার্থে করেন।"
মীর মনে করিয়ে দেন, "আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা অশান্তির চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনওবারই সেই চেষ্টা সফল হয় না। কারণ এর বিপরীতে যত সংখ্যক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ আছেন, তাঁরা হাল ধরেন। তাঁরা যতদিন আমাদের আশপাশে রয়েছেন, ততদিন আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমরা এই চ্যালেঞ্জে আগেই জিতে গেছি। তবু মাঝেমধ্যে বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটে, মিডিয়াতেও লেখালেখি হয়। তবে প্রশাসনের পক্ষে একা এই সমস্যা সামাল দেওয়া সহজ কাজ নয়। আমাদের সচেতন হতে হবে, নাগরিক হিসেবে আমাদের মনে দৃঢ় একটা বিশ্বাস তৈরি করতে হবে, যাই হোক না কেন, দেশ ভাঙতে দেব না, মানুষের ক্ষতি হতে দেব না। আমি নিজে ধর্মের অনেক উপরে মানুষকে রাখি। আমাদের আশপাশেও অসংখ্য ভালমানুষ রয়েছেন, যাঁদের সান্নিধ্যে আমরা নিরাপদে আছি। সুতরাং ভয় পাওয়ার কিছু নেই, চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্টেড।"
মীরের কথার সুর অনেকটাই মিলে গেছে বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দুর প্রধান গায়ক ও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। অনিন্দ্য এই অশান্তি ও সাধারণ মানুষের দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলেছেন, "একই গ্রহে একই আকাশ, একই হাওয়ায় আমরা থাকি। এটা যেন কোনও পরিস্থিতিতেই আমরা ভুলে না যাই। আমাদের মানবিকতা বোধ যেন জাগ্রত থাকে। সব ধর্মই মানবতার বার্তা দেয়। তাই যে ধর্মেরই মানুষই হোন, এটা মনে রাখতেই হবে। তাহলে আর হিংসা-হানাহানি এ সব আর আমাদের ছুঁতে পারবে না।"

তবে সাধারণের দায়িত্ব বা চ্যালেঞ্জের বিষয়টি একেবারেই মেনে নিচ্ছেন না অভিনেতা কৌশিক সেন। তাঁর কড়া প্রতিক্রিয়া, “সাধরণের চ্যালেঞ্জ বা অগ্নিপরীক্ষা— এই কথাগুলো শুনতে আলঙ্কারিক। সারা দেশে যেভাবে ক্ষমতার লড়াই চলছে, সারা দেশ যেভাবে 'পাওয়ার-হাংরি' একটা রাজনীতি প্রত্যক্ষ করছে, তাতে চোখের নিমেষে কিছু ঘটে যেতে পারে। সাধারণের সাধ্য নেই তা রোখার। একথা নেতিবাচক হলেও কঠোর সত্যি। বরং আমরা যারা প্রিভিলেজড ক্লাস, পড়াশোনা করেছি, একটু হলেও পরিচিত—সেই আমাদের একটা বড় দায়িত্ব বর্তায় সাধারণ মানুষকে বার্তা দেওয়ার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের এই শ্রেণির বড় অংশের মধ্যেও এখন সাম্প্রদায়িক ফিলিং চলে এসেছে। কারণ 'আমার সংস্কৃতি বিপন্ন, আমার ধর্ম বিপদের মুখে'-- এই ন্যারেটিভটা খুব অঙ্ক কষেই ছড়িয়ে দিয়েছে রাষ্ট্র, আমাদের বাঙালিদের একটা বড় অংশ তা বিশ্বাসও করছি। আমরা ইনফ্লুয়েন্সড হচ্ছি।"

কৌশিক স্পষ্ট বলেন, "শুধু আমাদের রাজ্য তো নয়, গোটা দেশেই সাধারণ মানুষ জীবন, জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত। তারা কোনওদিনই হিংসা চায়নি, প্ররোচনার ফাঁদে পা দিতে চায়নি। মেজরিটি হিন্দু বা মেজরিটি মুসলিম এই প্রক্রিয়ার বাইরে। যাঁরা রোজ পথে বেরিয়ে উপার্জন করেন, যে ধর্মেরই হোক না কেন, এই সমস্ত অশান্তি তাঁদের নিরাপত্তায় সবার আগে থাবা বসায়। তাঁদের দৈনন্দিন সংগ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লাভ হয় রাজনৈতিক দলের।"
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, "এই যে রামনবমী নিয়ে অশান্তি, এতে ছোট-বড় সমস্ত রাজনৈতিক দল নিজের মতো মাইলেজ পেয়েছে। বিজেপি, তৃণমূল তো বটেই, কংগ্রেস, সিপিএম-ও নিজেদের ঘুঁটি শক্ত করেছে এই ঘটনায়। ক্ষতি যা হওয়ার, হয়েছে সাধারণের। ফলে, সাধারণ মানুষ যে সাধ করে এই ফাঁদে পা দেবেন না, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই চ্যালেঞ্জ তাঁরা নিতেই চাননি কোনও দিন।"
বৃহস্পতিবার হনুমান জয়ন্তী, কী করা যাবে, কী করা যাবে না রাস্তায় বেরোনোর আগে জেনে নিন