দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: পুজো এলেই ট্রেনে চড়ে বসেন ভৈরব রুইদাস। পারি জমান কন্যাকুমারী। গত ১১ বছরে এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু এবার করোনা পরিস্থিতিতে সে সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে ভৈরববাবুর। ঘরের এককোণে রাখা ঢাকে নিয়ম মেনেই বোল তোলেন। তা তো নিছক মহড়া। পুজো এলেও এবার যে হারিয়ে গেছে সুখের চাবি। ঢাক বাজানোর ডাক আসেনি কন্যাকুমারী থেকে।
২ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে শক্তিগড়ের আমড়া গ্রামের দাসপাড়াকে লোকে ঢাকিপাড়া হিসাবেই চেনে। কমবেশি একশো ঘর ঢাকি আছে এই মহল্লায়। পুজো এলেই এই পাড়ার ঢাকিরা জেলা বা রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যান কন্যাকুমারী থেকে রাজস্থান। শুধু যে টাকা তা তো নয়, ঢাকের বোলে মানুষকে মাতিয়ে দিয়েও যে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। এ বার কোনও বায়না নেই এখনও। তাই ঢাকিপাড়ায় বাড়ছে মনখারাপ।
গত ১১ বছর ধরে পুজোর আগেই ট্রেনে চড়ে ভৈরব রুইদাস পাড়ি দেন কন্যাকুমারী। সেখানে বাঙালিদের দুর্গাপুজোয় তিনি প্রধান ঢাকি। ঢাক নিয়ে আসা যাওয়ায় হরেক সমস্যা। তাই তিনি ঢাক রেখে আসেন কন্যাকুমারীতেই। কিন্তু এবার পরিস্থিতিটা অন্যরকম। করোনার দাপটে ঢাক কন্যাকুমারীতে আর ঢাকি শক্তিগড়ে। বলেন,‘‘গত কিছুবছর আমি কন্যাকুমারীর বাঙালিদের ডাকে সেখানেই ঢাক বাজাতে যাই। আমার একটা ঢাক সেখানেই থাকে। এ তো ১১ বছরের অভ্যেস। এবার আর ওঁরা পুজো করছেন না। তাই আমাকেও আর ডাকেননি।’’
একই অবস্থায় দুর্যো আর সূর্য রুইদাসদের। গত বছর গিয়েছিলেন রাজস্থান। আশা ছিল এবারও যাবেন। কিন্তু মরুরাজ্য থেকে ডাক আসেনি। তাঁরা শুনেছেন, করোনার জন্য নাকি এবার সেখানে পুজো হবে না। আরও অনেকে আছেন যাঁরা পুজো শুরুর আগেই চলে যেতেন অন্য জেলায়। যেমন সনাতন রুইদাস। প্রতিবছর তিনি পুজোর সময় ঢাক বাজাতে যান হুগলির ডানকুনিতে। এবার এখনও কোনও বায়না আসেনি। তিনি বলেন, ‘‘যদি পুজো হয় তাহলে গ্রামেই বাজাবো। না হলে আর কিছু করার নেই।’’ শিয়ালদহ বা কলকাতার বিভিন্ন পুজোয় ঢাক বাজাতে যেতেন শান্তি রুইদাস। তিনিও এবার বেকার।
এলাকার ঢাকি সুশান্ত রুইদাস বলেন, ‘‘বড় বাজেটের পুজো উদ্যোক্তারা মোটা বায়নায় তাঁদের ছয় থেকে সাতদিন বাজানোর জন্য চুক্তি করতেন। কিন্তু এবার তাঁরা যোগাযোগ করছেন না। যাঁরা ডাকছেন তাঁরাও কম টাকায় বায়না করছেন।’’
শুধু দুর্গাপুজোই নয়, ঢাকিদের এবার সারাবছরই মার খেতে হয়েছে। গ্রামের গাজন উৎসব, রক্ষাকালীর পুজো সহ বিভিন্ন উৎসব বাতিল হয়েছে। তাই ঢাক থেকে গেছে ঘরের কোণেই। আশা ছিল দুর্গাপুজো, কিন্তু সেখানেও করোনার থাবা। আরেক ঢাকি মিঠুন রুইদাস, সৌমেন সাহারা বলেন, ‘‘ঢাক বাজানো বন্ধ, তাই অনেকে শক্তিগড়ের ল্যাংচার দোকানের সামনে মশলা মুড়ি বা অন্যকিছু বিক্রির কাজ করছেন। কেউ বা যাচ্ছেন চাষের কাজে।’’
অন্যবার শরৎ এলেই আলোয় ভেসে যায় ঢাকিপাড়া। এবার যেন বর্ষার মেঘ কাটছেই না আর।