দ্য ওয়াল ব্যুরো, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: কুলপি থেকে শ্রমিকের কাজ করতে যাওয়া এক যুবকের মৃত্যু হল মুম্বইয়ে। সেখানে কিছু দুষ্কৃতী তাকে পিটিয়ে মেরেছে বলে অভিযোগ। মৃতের নাম মনিরুদ্দিন গায়েন (২০)।
মঙ্গলবার নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন কুলপির কৃপারামপুর গ্রামের মানুষ। অধীর আগ্রহে গ্রামবাসীরা অপেক্ষা করছিলেন কখন এসে পৌঁছবে মনিরউদ্দিন গায়েনের নিথর দেহ। ধিক্কার-আতঙ্ক সব মিলেমিশে একাকার। নিরাপত্তার অভাবে ভুগতে শুরু করেছেন ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া অন্যান্য যুবকদের পরিবারের সদস্যরা।
একেবারেই সাদামাটা ছাপোষা গরিব পরিবারের ছোট ছেলে মনিরউদ্দিন। অসুস্থ বাবা গোলাম নবী গায়েনের একার পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। সংসারের অভাব ঘোচাতে বড় ভাই সালাউদ্দিন, মেজো ভাই মেজবাহউদ্দিন ও ছোট ভাই মনিরউদ্দিন ভিন রাজ্যে কাজ করতে চলে যান। আস্তে আস্তে ফিরতে শুরু করে সংসারের হাল। এর মাঝেই ঘটলো ছন্দপতন।
ছোট ভাই মনিরউদ্দিনকে হারিয়ে দিশেহারা বড় ভাই সালাউদ্দিন ও মেঝভাই মেজবাহউদ্দিন। আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে বেসামাল হয়ে পড়েছেন মা সলেহার বিবি। মাঝে মাঝে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন তিনি। ছোট ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন অসুস্থ বাবা।
বুধবার দুপুর ২ টো নাগাদ পরিবারের লোকেদের কাঁধে কৃপারামপুরে এল কফিনবন্দি মনিরউদ্দিনের নিথর দেহ। সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গ্রামের মানুষরা অপেক্ষা করছিল ওঁকে শেষদেখার। অভিযোগ, মহারাষ্ট্রে নির্মমভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে তাঁকে। ঘটনার সাক্ষী জখম আবুল খায়ের হালদার, জামির লস্কর, রহমাতুল্লাহ জমাদার, রাকিব মীর, আরিফ মোল্লা, তৌফিক মীর, হাফিজুল গায়েন, আনারুল গায়েন, নুরুজ্জামান খান, খুরশিদ খান। তাঁদের স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দুষ্কৃতীদের শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন গ্রামবাসীরা।
মনিরউদ্দিনের বোন সাইমা বিবি বলেন, ‘‘রবিবার সন্ধ্যায় আমার ভাই মনিরউদ্দিনের সঙ্গে কথা হয়। স্বাভাবিকভাবেই কথা হয়েছে আমার সঙ্গে। সকলে কেমন আছি তা জিজ্ঞেস করেছে। শেষে আমার মায়ের পাস বইয়ের নম্বর চেয়েছিল। হঠাৎ ফোনে খবর আসে ওদের ছেলেদের ধরে ওখানকার দুষ্কৃতীরা মারছে। তারপর ফোন কেটে যায়। আমার ভাইয়ের সঙ্গে আর কোনও কথা হয়নি। সকালে খবর পেলাম আমার ভাইকে ওরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। আর কোনদিনই কথা বলতে পারব না।’’
এক রকম প্রাণে বেঁচে ফেরা কৃপারামপুরের বাসিন্দা গুরুতর জখম আরিফ হোসেন মোল্লার চোখে মুখে এখনও আতঙ্কের ছাপ। সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। বড়দিদি তার শরীরে আঘাতের জায়গাগুলোতে ওষুধের প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছেন। সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা মনে উঠলে আতঙ্কে কেঁপে উঠছেন আরিফ। গরিব পরিবারের অনটন ঘোছাতে ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে এই রকম নির্মমভাবে মারধরের শিকার হতে হবে তা কল্পনাও করতে পারেননি তিনি।
আরিফ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘‘আমি মুম্বাইয়ে রেডিমেড পোশাকের কারখানায় কাজ করতে গিয়েছিলাম। আমরা ওখানে একসঙ্গে ২৫ থেকে ৩০ জন কাজ করতাম। রবিবার রাতে খবর পাই ওখানকার কিছু দুষ্কৃতী আমাদের ছেলেদের মারছে। এই খবর পেয়ে আমরা ওদেরকে বাঁচাতে যাই। ওরা রড, লাঠি ও হকির স্টিক দিয়ে আমাদের বেধড়ক মারধর করে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমরা মারা গিয়েছি ভেবে ওরা আমাদের দেহ লোপাট করার চেষ্টা করেছিল। পুলিশ আমাদের উদ্ধার করে। যখন আমার জ্ঞান ফেরে তখন আমি গুরু নানক হাসপাতালে।’’
আর্থিক সাহায্য দিয়ে নিহত গরিব পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় বিধায়ক যোগরঞ্জন হালদার ও গ্রাম পঞ্চায়েতের পক্ষে আব্দুর রহিম মোল্লা । সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিধায়ক মুখ্যমন্ত্রী দ্বারস্থ হবেন বলে জানা গিয়েছে। যোগরঞ্জন হালদার বলেন, আমাদের রাজ্যের ছেলেদের কর্মসংস্থানের জন্য ভিন রাজ্যে যেতে হচ্ছে। এরাও সেইমতো গিয়েছিল। এদের নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আমরা এর ধিক্কার জানাই।’’
বুধবার বিকেলে ধর্মীয় রীতি মেনে গ্রামের মাটিতেই মনিরউদ্দিনের দেহ কবর দেওয়া হয়। মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই থেমে গেছে তাঁর জীবন।