দেবব্রত সরকার, পশ্চিম মেদিনীপুর: দেশ জুড়ে চলছে লকডাউন। কচিকাঁচা থেকে শুরু করে বয়স্ক, বাইরে বেরোতে মানা সবারই। স্কুলে দীর্ঘ ছুটি। ঘরের মধ্যে থেকে গ্রাস করতে পারে হতাশা। তাই হোমওয়ার্কের খাতা নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছেন তলকুই জুনিয়র হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক।
শহরাঞ্চলের স্কুলপড়ুয়াদের অভিভাবকরা সচেতন। লকডাউনের জেরে স্কুল বন্ধ থাকলেও স্কুলের শিক্ষক বা প্রাইভেট টিউটরদের সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলিতে অনেকেই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। সরকার নিজস্ব ওয়েবসাইটে বাড়িতে থেকে পড়াশোনার জন্য নানান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই প্রান্তিক পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে সেই প্রচেষ্টার সুফল পৌঁছানো অনেকক্ষেত্রেই প্রায় অসম্ভব।
এই পরিস্থিতিতেই লড়াইটা শুরু করেছেন মেদিনীপুর সদর ব্লকের তলকুই উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অরিন্দম দাস। সরকার কর্তৃক প্রকাশিত হোমওয়ার্ক হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে ছাত্র ছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অরিন্দমবাবু বলেন, ‘‘আমার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশেরই বাড়িতেই স্মার্ট ফোন তো দূরের কথা, সাধারণ ফোনই নেই। তাই আমি ওই প্রশ্নপত্রগুলি ছাত্র সংখ্যার অনুপাতে প্রিন্ট করে সেগুলিকে ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি।’’
এই এলাকারই মানুষ অরিন্দমবাবু। তাঁর ভাবনা, এমন জরুরি পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় পড়াশোনা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে হতদরিদ্র পরিবারগুলি থেকে আসা অনেক পড়ুয়াই। কঠিন হবে তাদের অনেককেই আবার পড়াশোনায় ফেরানো। এসব ভেবেই স্ত্রী পায়েলকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন দু’জন। প্রিয় শিক্ষককে গ্রামে ঢুকতে দেখে এক ছুটে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে রাহুল, বৃষ্টি, মামনিরা। অনেকদিন পর ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পেয়ে মন ভরছে শিক্ষকেরও। তবে সরকারি বিধিনিষেধ মেনে সবাইকে দূরে দাঁড় করিয়েই চলছে কথোপকথন। প্রথমেই আরও একবার করোনা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার মন্ত্র মনে করিয়ে দিচ্ছেন। তারপরে পারিবারিক গল্প, পড়াশোনার কথা। এরপর হাতে খাতা ধরিয়ে দিয়ে তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন কীভাবে সরকার নির্দেশিত হোমওয়ার্ক লিখে যত্ন করে রাখতে হবে নিজের কাছে।
অরিন্দমবাবু জানেন, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাইরে যাওয়ার জন্য ছটফট করবেই। তাই তাদের বাড়িতে কিছু সময় আটকে রাখার জন্য সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন ড্রয়িং খাতা এবং রঙ পেন্সিল। সেগুলি তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলছেন, ‘‘স্কুল খুললে যেন দেখি সব পৃষ্ঠায় ছবি আঁকা রয়েছে।’’
এই প্রধানশিক্ষকের কথায়, ‘‘ছাত্র-ছাত্রীরা তো আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। অক্সিজেন ছাড়া মানুষ বাঁচে নাকি!’’