দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: সরকার দ্রুত হিমঘর খালি করার নির্দেশ দিলেও তৃণমূলের শ্রমিক নেতার দাদাগিরিতে বেকায়দায় পড়ে গিয়েছেন হিমঘর কর্তৃপক্ষ। এই বিষয়ে পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক ও কৃষিবিপণন দফতরে অভিযোগ জানিয়েছে ওয়েস্টবেঙ্গল কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন।
তাঁদের অভিযোগ, “তৃণমূলের শ্রমিক নেতা সেখ মইনুদ্দিনের দাদাগিরিতে জামালপুরের বেশ কয়েকটি হিমঘর থেকে আলু বের করার কাজ করা যাচ্ছে না। এমনকী দু’টি হিমঘর বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে।” কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন ছাড়াও ‘পশ্চিমবঙ্গ শ্রমিক ঠিকাদার কল্যাণ অ্যাসোসিয়েশন’ও তৃণমূলের শ্রমিক নেতা সেখ মইনুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে ।
তারা অভিযোগ করেছে ,তৃণমূল নেতা সেখ মইনুদ্দিন হিমঘরে তাঁদের শ্রমিকদের কাজ করতে দিচ্ছে না। শ্রমিকরা কাজ করতে চাইলে তাঁদের মারধরের হুমকি দেওয়া হচ্ছে । যদিও অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা সেখ মইনুদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মানতে চাননি। তবে জামালপুরের অন্য তৃণমূল নেতারা চাইছেন সেখ মইনুদ্দিনের দাদাগিরি রুখতে প্রশাসন কড়া ব্যবস্থা নিক।
জামালপুর থানার জানকুলি গ্রামে বাড়ি তৃণমূল শ্রমিক নেতা সেখ মইনুদ্দিনের । তিনি নিজেকে আইএনটিটিইউসির জেলা নেতা বলে দাবি করেন। সম্প্রতি তিনি তাঁর সহযোগী কয়েকজনকে নিয়ে জামালপুরের চকদিঘি এলাকার একটি হিমঘরে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে হুমকি দেয় বলে অভিযোগ। ওইসময় হিমঘরের মালিকের সঙ্গে তৃণমূল শ্রমিক নেতার চুড়ান্ত তর্কাতর্কি বেঁধে যায়। সেই তর্কাতর্কির ভিডিও ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গিয়েছে । ওই ভিডিওয়েতে দেখা যাচ্ছে তৃণমূল শ্রমিক নেতা সেখ মইনুদ্দিনকে হিমঘরের মালিক বলছেন, ‘‘বারবার হিমঘরের ভিতর ঢুকে শ্রমিকদের হুমকি দিয়ে কাজ বন্ধ করতে আসলে আপনার নামে এফআইআর করতে বাধ্য হব। আপনি এ ভাবে হিমঘরের ভিতর ঢুকে হুমকি দিতে পারেন না। যা করার বাইরে করুন। আপনার কোনও সমস্যা বা দাবি থাকলে সেটা অ্যাসোসিয়েশনকে জানান।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওয়েতে আরও দেখা যাচ্ছে হিমঘর মালিকের পাশে থাকা অপর এক প্রবীণ ব্যক্তি সেখ মইনুদ্দিনকে বলছেন, ‘‘আপনি তো অনেকবার এসে টাকা নিয়ে গেছেন। তা সত্ত্বেও কেন হিমঘরে এসে এইভাবে কাজ বন্ধ করে দিচ্ছেন।’’ তর্কাতর্কির সময়ে পাল্টা জবাবে তৃণমূল নেতা সেখ মইনুদ্দিনকে বলতে দেখা যায়, “জেলার আইএনটিটিইউসি নেতাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হল না । কলকাতা থেকে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেল । আমরা কিছু জানতে পারলাম না। আমরা বাইরে গেটে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনারা বের হতে পারবেন না। কাজও বন্ধ থাকবে।”
এরপরেই ওয়েস্টবেঙ্গল কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সম্পাদক তরুণকান্তি ঘোষ জেলাশাসককে চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি জেলাশাসককে জানান, সরকার হিমঘর খালি করার নির্দেশে দিয়েছে। সেই নির্দেশ মেনে এখন হিমঘরগুলি থেকে আলু বের করার কাজ চলছে। সহায়কমূল্যে আলু পাঠানো হচ্ছে সুফল বাংলা স্টলে। এই অবস্থায় হিমঘর খালি করার কাজে এক নেতা শ্রমিকদের বাধা দিচ্ছে। ফলে, আলু বের করতে সমস্যা হচ্ছে। ওই চিঠির সঙ্গেই তরুণকান্তিবাবু পশ্চিমবঙ্গ শ্রমিক ঠিকাদার কল্যাণ অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগপত্রটিও জুড়ে দেন। তরুণবাবু দাবি করেন, বুধবারও জামালপুরের দু’টি হিমঘরে কাজ হয়নি।
ঠিকাদার কল্যাণ সংগঠনের পক্ষে মধুসূদন দাস জানিয়েছেন, “গত ২৫ নভেম্বর রাজ্যস্তরে দক্ষিণবঙ্গের হিমঘর শ্রমিকদের নিয়ে একটি চুক্তি হয়। সেই চুক্তি মানতে চাইছেন না জামালপুরের আইএনটিটিইউসি নেতা শেখ মইনুদ্দিন। এমনকি তিনি শ্রমিকদের মারধরের হুমকিও দিচ্ছেন। যদিও অভিযুক্ত তৃণমূলের শ্রমিক নেতা সেখ মইনুদ্দিন এইসব অভিযোগ মানতে চাননি। ওই নেতার বক্তব্য ,“আমাদের বাদ দিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোনও এক শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করেছে হিমঘর মালিকরা। তাই শ্রমিকদের কাজের দাবি, মজুরি বৃদ্ধি ও বোনাসের দাবি নিয়ে হিমঘরে কথা বলতে গিয়েছিলাম। সেটাই হিমঘর মালিকরা মেনে নিতে পারেনি। আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।’’
এইসব ঘটনা সামনে আসার পর জামালপুর ব্লক তৃণমূলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নড়েচড়ে বসেন। খোঁজ নিয়ে তাঁরা জানতে পারেন সেখ মইনুদ্দিনের দাদাগিরির জেরে জামালপুরের তিনটি হিমঘরে কাজকর্ম বন্ধ হয়ে রয়েছে। সেই হিমঘরগুলিতে কাজ শুরুর ব্যপারে বুধবার থেকে তৎপরতা শুরু করে দেন ব্লক তৃণমূল নেতারা। ব্লক তৃণমূলের এক নেতা বলেন, ‘‘সেখ মইনুদ্দিনের জন্য বারবার দলের মুখ পুড়েছে। পুলিশ ওর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দলের কারুর কিছু যায় আসে না।’’
এদিন চকদিঘির হিমঘরের মালিক অনির্বাণ কুণ্ডু বলেন, “আমরা ওই নেতার হুমকির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি, প্রতিবাদ করেছি। সে জন্যে আমরা কাজ চালু রাখতে পেরেছি। অন্যরা প্রতিবাদ করতে না পারায় তাঁদের কাজ হচ্ছে না। বছর বছর ধরে ওই নেতার দাদাগিরির জন্য আমরা অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছি।’’
জেলাশাসক এনাউর রহমান বলেন, “চিঠি পাওয়ার পর আমি কৃষি বিপণন দফতরকে খোঁজ নিতে বলেছিলাম। ওই দফতর থেকে জানিয়েছে, কোনও সমস্যা আর নেই। এখন হিমঘর খোলা রয়েছে।’’