দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: সেচখালের জলে হাত-পা বেঁধে ফেলার আগে গলসির পঞ্চায়েত সদস্যের ৯ বছরের ছেলে সন্দীপ দলুইকে মদ খাইয়ে অচেতন করা হয়েছিল। পুলিশের দাবি, জেরার মুখে অপরাধীরা কবুল করেছে যে সেদিন সন্দীপকে অপহরণ করার পর বাইকে চাপিয়ে সেচখালের পাশে একটি মোবাইল সংস্থার অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তাকে লুকিয়ে রাখা হয়।
এরপর সেচখালের পাশে বসে তিন অভিযুক্ত মদ্যপান করে। সেখানে বসেই মুক্তিপণের টাকা দাবি করে তারা। শেষমেশ টাকা না পেয়ে ধরা পড়ার ভয়ে সন্দীপকে হাত-পা বেঁধে সেচখালের জলে ফেলে দেয়। তারপর বাইক নিয়ে ঘরে ফিরে যায় খুনিরা। ঘটনাস্থল থেকে খালি মদের বোতল ও সবুজ রঙের একটি কাপড়ের টুকরো বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। সেই কাপড়ের অংশ দিয়েই সন্দীপের হাত-পা বাঁধা হয়েছিল। ফিঙ্গার প্রিন্ট বিশেষজ্ঞরা মোবাইল সংস্থার অফিস থেকে খুনে জড়িতদের হাতের ছাপের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। মদের বোতলেও তাদের হাতের ছাপ পাওয়া গিয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে মাটির নমুনাও সংগ্রহ করেছে পুলিশ। খুনের অভিযোগে ধৃত ৩ জনের সে দিনের পোশাকও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তাতে কাদার দাগ পাওয়া গেছে। পোশাকের কাদার সঙ্গে ঘটনাস্থলে সংগৃহীত মাটির নমুনা বেলগাছিয়ার ফরেন্সিক ল্যাবরেটারিতে মিলিয়ে দেখার জন্য পাঠানো হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহিত হাতের ছাপের নমুনাও মেলাবেন ফিঙ্গার প্রিন্ট বিশেষজ্ঞরা।
১০ দিনের পুলিসি হেফাজতের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ঘটনায় ধৃত সুব্রত মাঝি ওরফে বাদশা, মঙ্গলদীপ দোলুই ও জয়ন্ত বাগকে সোমবার বর্ধমান আদালতে পেশ করা হয়েছিল। ধৃতদের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়ে ১২ অক্টোবর ফের আদালতে পেশের নির্দেশ দেন সিজেএম রতনকুমার গুপ্তা। ধৃতদের হাতের ছাপের নমুনা সংগ্রহ করার জন্য আবেদন জানান তদন্তকারী অফিসার প্রীতম গুহ। তৃতীয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তিনজনের হাতের ছাপের নমুনা সংগ্রহ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
মুক্তিপণ চেয়ে সন্দীপের বাবার কাছে বেশ কয়েকবার ফোন এসেছিল। তা তিনি রেকর্ড করে রাখেন। তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য ধৃত তিনজনের কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহের আবেদন জানান তদন্তকারী অফিসার। সেই আবেদনও মঞ্জুর করেছেন বিচারক। মামলাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। মামলাটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই সাইবার তথ্যের উপর নির্ভরশীল। সেজন্য রাজ্যের এক সাইবার বিশেষজ্ঞকে এই মামলায় বিশেষ পিপি নিয়োগ করার ব্যাপারে সরকার চিন্তা-ভাবনা করছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। সাইবার বিশেষজ্ঞ সেই আইনজীবী ইতিমধ্যেই মামলার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন বলে থানা সূত্রে জানা গিয়েছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রামে মনসা পুজো ছিল। বাড়ির পাশেই মন্দিরে পুজো দেখতে ওইদিন বিকালে বাড়ি থেকে বের হয় সন্দীপ। তারপর থেকেই আর তার খোঁজ মিলছিল না। রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ তার বাবা তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য বুদ্ধদেব দলুইয়ের মোবাইলে ফোন করে ছেলেকে অপহরণের কথা জানানো হয়। ছেলেকে মুক্ত করতে হলে ৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ বাবদ দিতে হবে বলে জানানো হয় তাঁকে। বেশ কয়েকবার অপহরণকারীরা মুক্তিপণ চেয়ে তার বাবাকে ফোন করে। কিন্তু, তিনি মুক্তিপণের টাকা দেননি। পরের দিন সকালে সাঁকোয় সেচখালের পাশ থেকে সন্দীপের হাত-পা বাঁধা দেহ উদ্ধার হয়।
তদন্তে পুলিস জেনেছে, সন্দীপকে অপহরণের পর একটি বাইক নিয়ে সুব্রত সেচখালের পাড়ে চলে যায়। মঙ্গলদীপ ও জয়ন্ত অপর বাইকে সন্দীপকে নিয়ে সেখানে আসে। সেচ খালের পাশে বসে মদ খায় তারা। মোবাইল টাওয়ারের ঘরে আটকে রাখে সন্দীপকে। খুনের পর সন্দীপের হাতে থাকা একটি রুপোর চেন সহ তাবিজ ও গলার লকেট সহ হার তারা নিয়ে নেয়। সেগুলিও পুলিশ ধৃতদের বাড়ি থেকে বাজেয়াপ্ত করেছে।