দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: হাজারো প্রতিকূলতা কাটাতে হয়েছে প্রতিদিন। কিন্তু তার কোনও ছাপ পরীক্ষার ফলে পড়তে দেননি হতদরিদ্র খেতমজুর রঞ্জিত মালের বড় মেয়ে পিয়ালী। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ৪১০ নম্বর পেয়ে গোটা এলাকাকে চমকে দিয়েছেন এই মেধাবী ছাত্রী। পূর্ববর্ধমানের হাটশিমূল গ্রামে পিয়ালীর মামার বাড়ি। স্থানীয় কাঁঠালগাছি নিম্নবুনিয়দি বিদ্যালয়ে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে শ্রীরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন । সেই স্কুল থেকেই এবার উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছিলেন। বাংলায় ৮০, ইংরাজিতে ৬০, এডুকেশনে ৮২, ভূগোলে ৮৪, সংস্কৃততে ৮২ আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিয়ালী পেয়েছেন ৮২ নম্বর।
হুগলি জেলার ভুষালি গ্রামে বাড়ি পিয়ালীর। পরপর দুই মেয়ে হওয়ায় চরম সমস্যায় পড়েন হতদরিদ্র রঞ্জিত মাল। ছোট মেয়েকে নিজের কাছে রেখে বড় মেয়ে পিয়ালীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় মামার বাড়িতে। তখন পিয়ালীর বয়স মেরেকেটে দেড় বছর। তখন থেকে পূর্ব বর্ধমানের হাটশিমূল গ্রামে দিদা কদম মাল ও মাসি রাসমনি মালিকের কাছে বড় হয়েছেন পিয়ালী।
আরও অনেকের মতোই মাধ্যমিক পাশ করতেই বিয়ের বন্দোবস্ত হয়ে গেছিল পিয়ালীর। কিন্তু তখন প্রশাসন সেই বিয়ে আটকে দেয়। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে পিয়ালীও। ছোট থেকেই পড়াশোনার অদম্য আগ্রহ। চাইল্ড লাইনের পক্ষ থেকে তাঁকে কাউন্সেলিং করা হয়। শুরু হয় আবার নতুন করে পড়াশোনা। আর্থিক অনটনের জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় কাজ নেন পিয়ালী। সেখানে প্লাস্টিকের পুতুল তৈরি করে আয়ের একটা রাস্তা হয়। পাশাপাশি চলে পড়াশোনা।
উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা চলাকালীনই তাঁর মামারবাড়িতে কালীপুজো হয়েছিল। তারপরেই পাড়ার কিছু মানুষজন তাঁর মাসি রাসমনি মালিককে ডাইনি অপবাদ দেয়। শুরু হয় নিত্য অশান্তি। মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে তাঁর মাসি। পুরো পরিবারের উপরেই সেই চাপ এসে পড়ে। তবে এই সমস্ত বাধাই পিয়ালী কাটিয়েছেন মনের জোরে। অদম্য ইচ্ছায় সবকিছু পাশে ফেলে পরীক্ষার পড়া করেছেন। আর এতেই মিলেছে সাফল্য। বিদ্যালয়ের কন্যাশ্রী ক্লাবের দলনেত্রী পিয়ালী। তাঁর একটাই লক্ষ্য ১৮ বছরের কম বয়সে যেন কোনও মেয়ে বিয়ে না করে, ঘরে ঘরে সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়া। তাই পড়াশোনা, কাজ করে পড়াশোনার খরচ জোগাড়ের পাশাপাশি এই সামাজিক বার্তা দেওয়ার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
হাজারো বাধা বিপত্তি কাটিয়ে পিয়ালীর এমন ফলে দারুণ খুশি তাঁর স্কুলের শিক্ষকরাও। হাটশিমূল গ্রামের বাসিন্দা প্রাক্তন শিক্ষক বসন্ত রায় বলেন, ‘‘বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়িয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ভাল ফল করেছে পিয়ালী। এটা প্রত্যেকের কাছেই একটা বড় দৃষ্টান্ত।’’