
শেষ আপডেট: 5 September 2019 14:07
তাই বাড়িতেই পাঠশালা খুলে বসেছেন পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রাম উত্তর রামনাগরের সুজিত চট্টোপাধ্যায়। প্রায় তিনশো ছাত্রছাত্রীকে টিউশন পড়ান তিনি। পাঠশালার নাম, সদাই ফকিরের পাঠশালা। বেতন, ছাত্র-প্রতি বছরে মাত্র দু'টাকা! গুরুদক্ষিণা হিসেবে ওই টাকা নেওয়া হয়। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে, গুরুকে এই দু'টাকার দক্ষিণা দিয়ে প্রণাম করে যায় ছাত্রছাত্রীরা৷ শুধু তা-ই নয়। পড়ানোর পাশাপাশি গোটা থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়ে কাজও করেন তিনি। থ্যালাসেমিক রোগীদের আর্থিক সাহায্য করা থেকে শিবির করে সচেতনতারও চেষ্টা করেন সুজিত চট্টোপাধ্যায়।
১৯৬৫ সালে নিজের গ্রামেরই স্কুল রামনাগর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সুজিত বাবু৷ ২০০৪ সালে ওই স্কুল থেকেই অবসর গ্রহণ করেন, প্রধান শিক্ষক হিসেবে৷ তবে সরকারি খাতায়কলমে অবসর নিয়ে নিলেও, ছাত্রছাত্রীদের থেকে দূরে সরে থাকতে পারেননি সুজিতবাবু৷ তাই স্কুল ছাড়ার পরে বাড়িতেই শুরু করেন পড়ানো৷
আউশগ্রাম জঙ্গলমহল এলাকায় প্রচুর অদিবাসী মানুষের বসবাস। এই জনজাতির একটা বড় অংশ আজও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এই বঞ্চনার বিরুদ্ধেই শিক্ষাকে অস্ত্র করেছেন সুজিতবাবু। আদিবাসী এবং দুঃস্থ পরিবারের ছেলেমেয়েদের স্কুলমুখী করে পড়াশোনায় উৎসাহ জুগিয়ে আসছেন তিনি৷ সেই সঙ্গে পড়াচ্ছেন নিজেও।
অন্য দিকে, কয়েক বছর আগে সুজিতবাবুর উদ্যোগেই আউশগ্রামে শুরু হয়েছে থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা শিবির ও আক্রান্তদের সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা। প্রতি বছর সরস্বতী পুজোর পরে একটি দিন ঠিক করে, এই শিবিরের আয়োজন করা হয়। শিবিরের সমস্ত ব্যবস্থাপনা করে পড়ুয়ারাই। বিভিন্ন গ্রামে থ্যালাসেমিয়ার সচেতনতার প্রচার চালায় তারা।
সুজিতবাবু জানান, শুধু ক্যাম্পের দায়িত্বই নয়। তাঁর প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রী নিজে ১০০ টাকা করে দিয়ে, গত বছর তিন জন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তের হাতে ১০ হাজার টাকা করে তুলে দিয়েছিল। এই বছর সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে।
কেন হঠাৎ এই উদ্যোগ? সুজিতবাবু বলেন, "আউশগ্রামের জঙ্গলমহল এমনিই পিছিয়ে পড়া এলাকা। তাই এই রোগ শরীরে বাসা বাঁধা থাকলেও কেউ বুঝতে পারে না এখানে। সেই কারণেই থ্যালাসেমিয়া শনাক্তকরণ শিবির করেছিলাম। তারপর ওদের নিয়ে কাজ করতে শুরু করলাম। ছাত্রছাত্রীদের পাশে পেলাম, গ্রামের কিছু মানুষ এগিয়ে এল।"
সুজিতবাবুর বাড়িতে রয়েছেন স্ত্রী মীরা চট্টোপাধ্যায়। ছেলে কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন বৌ-ছেলে নিয়ে। সুজিতবাবুর মেয়ের বিয়ে হয়েছে গেছে অনেক দিন। জীবনের এই পর্যায়ে পৌঁছে ঝাড়া হাত-পায়ে বিশ্রাম নিয়ে অবসর জীবন কাটাতেই পছন্দ করেন বেশির ভাগ মানুষ। কিন্তু সুজিতবাবু ব্যতিক্রম। তাই শেখানোর কাজ থেকে ছুটি নিতে চান না মোটেই।