
শেষ আপডেট: 5 September 2023 09:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পুরুলিয়া : স্কুলের পে-রোলে নাম নেই তাঁর। এমন কী কোনও সম্মান দক্ষিণাও নেন না। তবে রোজ আদ্রা থেকে ১৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কাশিপুরের স্কুলে আসেন তিনি (Purulia Teacher)। দিনভর পড়িয়ে ছুটি হলে বাড়ি যান সেই চারটের সময়।
প্রায় ষাট ছুঁই ছুঁই বয়স মদন চক্রবর্তীর (Purulia Teacher)। ছোটখাট একটা ব্যবসা আছে তাঁর। ভাল তবলাও বাজান। তবলা শিখতে তাঁর কাছে আসেন বেশ কিছু ছাত্র। এ সমস্ত কিছুই সকাল ন’টার আগে আর বিকেল পাঁচটার পর। দিনের ওই সময়টুকু শুধু রাখা থাকে কল্লোলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খুদে পড়ুয়াদের জন্য।
কাশিপুরের এই স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ৭১। শিক্ষক-শিক্ষিকা ৩ জন। আর আছেন মদনবাবু। গত ১৪ বছর ধরে রোজ স্কুলে আসেন তিনি। বাচ্চাদের বাংলা শেখান, ইংরেজি শেখান, শেখান অঙ্ক। ১৪ বছর ধরে বয়ে যাওয়া ছাত্রধারার সঙ্গে কখন যেন জড়িয়ে গেছে জীবনটা। ‘‘এখন বেঁচে থাকার মোটিভেশনটাই আমি সংগ্রহ করে নিয়ে যাই এখান থেকে। স্কুলে আসবো না, ওদের পড়াবো না, ভাবতেই পারি না। আমার রুটি রুজি অন্য। কিন্তু অক্সিজেনটা তো নিয়ে যাই এখান থেকেই।’’ অকপট মদনবাবু (does not teach for money)।
সকাল দশটায় তিনি স্কুলে ঢুকলেই ঘিরে ধরে নীলিমা, সোনালী, তনুশ্রীরা। ছড়া শিখতে। অঙ্ক না পারলে বকুনিও খায়। তবে সব ভুলে আবার বন্ধুত্ব হয়ে যায় অচিরেই। শিক্ষক তো তিনি বটেই, তার থেকেও বেশি যেন বন্ধু। ‘‘জানেন, যখন এ পাড়া দিয়ে হেঁটে আসি, এই স্কুলের কত পুরনো ছাত্র দেখা হলে ছুটে আসে স্যার স্যার করে। এত ভালো লাগে তখন। টাকার থেকে কোন অংশে কম বলুন তো এই পাওনাটা?’’ মদন স্যারের গলায় ঝরে পড়ে আবেগ।
স্কুলের টিচার ইনচার্জ রিনা কর্মকার বলেন, ‘‘স্কুলে ঢোকার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্য বসেন না। অন্যান্য সহ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে সমানতালে ক্লাস নেন। উনি যেন সবারই অভিভাবক। এমন একজন মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে আমরা সত্যিই খুব খুশি।’’
আর স্কুল পরিদর্শক অলোক মহাপাত্র বলছেন, ‘‘এক্সিলেন্ট ফিলিং থেকে এই কাজটা করেন উনি। বছরের পর বছর ধরে। এটা ওনার নেশা। এমন মানুষ সত্যিই বিরল। শিক্ষকতার কাজে নিজেকে মোটিভেট করে অন্যকেও মোটিভেট করছেন তিনি।’’
মদনবাবুর স্ত্রী অন্য স্কুলের শিক্ষিকা। আর সরকারি ভাবে নাম না থাকলেও তিনি শিক্ষক কাশিপুরের কল্লোলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। ভবিষ্যত প্রজন্মকে তৈরি করতে পাশাপাশি পথ হাঁটছেন দুজন। ‘‘অবসরের বয়স হলে সরে দাঁড়াবেন স্ত্রী। কিন্তু আমার তো ইচ্ছে অবসর।’’ আলো ছড়িয়ে পড়ে মদন স্যারের মুখে।
আরও পড়ুন: প্রথমে হাঁটা, তারপর নৌকো, শেষে পাহাড়ে চড়া, এ ভাবেই রোজ স্কুলে পৌঁছন ঊষা দিদিমনি