দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত রবিবার হলদিয়ার সভা থেকে বড় ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেছিলেন, বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় এলে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই কিষাণ সম্মান নিধি বাস্তবায়ণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই খাতে পুরনো টাকাও পেয়ে যাবেন চাষীরা। অর্থাৎ বিজেপি সরকার গঠনের কিছু দিনের মধ্যেই বাংলায় কমবেশি ৯০ লক্ষ কৃষক পরিবার ১৪ হাজার টাকা করে পাবেন।
দু’দিন আগে ঠাকুরনগরের সভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ আবার বলেছেন, বাংলায় বিজেপি সরকার গঠন করতে পারলে কৃষকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরসারি ১৮ হাজার টাকা করে পাঠাবে নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণার পরই দেখা গিয়েছে, প্রতিটা সভায় গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বেশি কৃষককে আর্থ সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলছেন। দ্রুত ধান কেনার জন্য সরকারি অফিসারদের নির্দেশ দিচ্ছেন। তার পর আজ শনিবার কুলপীর সভায় অমিত শাহদের সেই প্রতিশ্রুতিকেই কথার মারপ্যাঁচে তৃণমূলের অনুকূলে আনার চেষ্টা করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের কথায়, “বাংলার মানুষ কি হাটের গরু ছাগল, যে আপনাকে ভোট দেবে আর আপনি ১৮ হাজার টাকা করে দেবেন। এরা বাংলার মানুষকে কিনতে এসেছে। আপানার তার জবাব দেবেন কি দেবেন না। এই মাটি ক্ষুদিরামের মাটি, এই মাটি মেরুদণ্ড বিক্রি করবে না।”
১৪ হাজার না ১৮ হাজার, নরেন্দ্র মোদী ঠিক নাকি অমিত শাহ?
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের কর্তারা বলছেন, দুজনেই ঠিক। পিএম কিষাণ সম্মান নিধির আওতায় কৃষকদের বছরে তিন কিস্তিতে ২০০০ টাকা করে মোট ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়। যে সব কৃষকের জমির আয়তন ২ হেক্টরের কম, তাঁরাই এই প্রকল্পের সুবিধা পান। দুটি আর্থিক বছরে অন্য রাজ্যের চাষীরা মোট ১২ হাজার টাকা পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, মে মাসে বিজেপি সরকারে এলে ওই ১২ হাজার টাকা তো পাবেনই সেই সঙ্গে নতুন আর্থিক বছরের প্রথম কিস্তির ২ হাজার টাকাও পাবেন। অর্থাৎ ১৪ হাজার টাকা পাবেন। আর অমিত শাহ বকেয়ার ১২ হাজারের সঙ্গে আগামী অর্থবর্ষের ৬ হাজার টাকা যোগ করে ১৮ হাজার টাকা বলেছেন।
বাংলার চাষীরা কেন্দ্রের ১২ হাজার টাকা পায়নি কেন
কারণ, রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার পিএম কিষাণ সম্মান প্রকল্প বাংলায় চালু করতে দেননি। এই প্রকল্পে রাজ্যের কোনও আর্থিক অংশিদারিত্ব নেই। অর্থাৎ রাজ্যকে এই প্রকল্প খাতে ১ টাকাও দিতে হয় না। ভোটের আগে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী এখন চিঠি লিখে বলেছেন, তিনি ওই প্রকল্প শুরু করতে চান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট অভিযোগ করে গিয়েছেন, ১) রাজ্য প্রকল্প শুরু না করায় বাংলার ২৭ লক্ষ কৃষক অনলাইনে আবেদন করেছেন কেন্দ্রের পোর্টালে। কিন্তু রাজ্য মাত্র ৬ হাজার কৃষকের নাম ভ্যালিডেট করে পাঠিয়েছে। তাও রাজ্যের এজেন্সির ব্যাঙ্ক ডিটেলস পাঠায়নি, তাই ওই ৬ হাজার কৃষককেও টাকা পাঠানো যায়নি।
সত্যিই ভোট কেনাই কি উদ্দেশ্য মোদী-শাহর
কেন্দ্রের পিএম কিষাণ সম্মান নিধি প্রকল্পের প্রশংসা করেছেন অর্থনীতিকদের একটা বড় অংশ। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ মোদী সরকারের করনীতির সমালোচনা করলেও বলেছিলেন, পিএম কিষাণ সম্মান নিধি প্রকল্পে সরকার সরাসরি টাকা পাঠালে তাই গ্রামীণ এলাকায় চাহিদা তৈরি করবে। চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন ও যোগান বাড়বে। তাতে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে।
দেশের অন্য রাজ্যের কৃষকরা এই প্রকল্প বাবদ গত দু’বছর ধরে টাকা পাচ্ছেন। তাই বলা যেতে পারে, বাংলার কৃষকদেরও তা হকের টাকা।
পিএম কিষাণ ও রাজনীতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলেন, মোদীর মডেল যা দিদির মডেল তা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজ শ্রীর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে উপভোক্তা শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছেন। নরেন্দ্র মোদীও তেমনই উজ্জ্বলা, পিএম কিসান, আজীবিকা প্রকল্পের মাধ্যমে উপভোক্তা শ্রেণি তৈরি করার যোজনা নিয়েছেন প্রথম দিন থেকেই।
বাংলায় কমবেশি ৯০ লক্ষ কৃষক পরিবার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কৃষক সম্মান নিধির শর্ত হল, ৪ হেক্টরের কম জমির মালিক হলে তবেই এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। বাংলায় বেশিরভাগ কৃষকের কাছে একলপ্তে বড় জমি নেই। অধিকাংশের জমির আয়তন চার হেক্টরের কম। ফলে বিজেপি এই ৯০ লক্ষ পরিবার তথা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি ভোটারের মন পেতে চাইছে। তা ঠেকাতে চাইছে শাসক দল। লড়াইটা এখানেই।