দ্য ওয়াল ব্যুরো: আন্দোলনের আঁচ এনআরএস ছাড়িয়ে সারা শহর পেরিয়ে, দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে গেছে। এমনকী আন্দোলেন আন্তর্জাতিক পরিধিও এখন সাড়া ফেলেছে মানুষের মধ্যে। কিন্তু এ সবের মধ্যেও এই চার দিন ধরে আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকেরা বারবার প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাংলার বিশিষ্ট জনেরা কোথায়! কেন তাঁদের দেখা যাচ্ছে না বিক্ষোভে। কেন গলা তুলছেন না তাঁরা!
আজ, শুক্রবার সকালেই এনআরএসের ধর্না মঞ্চে দেখা গেল তাঁদের, বক্তব্য রাখলেন তাঁরা। বিশিষ্ট জনেদেরও পাশে পেল আন্দোলন। তবে আন্দোলনের পাশে থাকা মানে যে আসলে মানবিকতার পাশে থাকা, সে মানবিকতার খাতিরে তাঁরা চাইছেন রোগী পরিষেবাও সচল হোক-- সে কথাও মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না কেউ-ই। মনে করিয়ে দিলেন, আন্দোলন যেন প্রতীকী হয়। এ ভাবে পরিষেবা অচল না হয়। সাধারণ মানুষেরই শুধু ক্ষতি হয়ে যাবে তাতে।
শুক্রবার সকালেই এনআরএস-এ যান অপর্ণা সেন, বোলান গঙ্গোপাধ্যায়, কৌশিক সেন, দেবজ্যোতি মিশ্র এবং আরও বেশ কয়েক জন। সেখানে আন্দোলনরত ইন্টার্ন এবং জুনিয়র ডাক্তারদের সমর্থন জানান তাঁরা সকলেই। ডাক্তারদের সমব্যথী হয়ে এ দিন অপর্ণা সেন বলেন, "মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে আমার অনুরোধ, এক বার এখানে আসুন। ওদের সঙ্গে কথা বলে ওদের সমস্যাটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন। আপনি তো ওদের থেকে বয়সে বড়। ওদের অভিভাবক-মায়ের মতো। জানি আপনি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি তো পূর্ণমন্ত্রী। এক বার এসে কথা বলুন। আমিও তো এসেছি ওদের সঙ্গে কথা বলতে। কী সমস্যা আছে? আমার বিনীত অনুরোধ আপনিও আসুন।"
এর পরে আন্দোলনরত ডাক্তারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "বিভিন্ন জেলা থেকে সব রত্নরা এসেছে ডাক্তারি পড়তে। ওরা বাইরের রাজ্যে চলে গেলে কারও ভাল হবে? আমি জানি রোগীদের কষ্টে ওদেরও খারাপ লাগছে, কষ্ট হচ্ছে। কারণ চিকিৎসার সময়ে কোনও ডাক্তার রোগীর জাত-ধর্ম-রং-বর্ণ এ সব দেখেন না। তবে তাঁদের উপর আক্রমণ হলে কাজ করা সত্যিই সমস্যার। এক জন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি চাই, যে অচলাবস্থা থেকে বেরোনোর একটা রাস্তা বার করতে হবে।"
ইন্টার্ন এবং জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন অভিনেতা কৌশিক সেনও। তিনি বলেন, "এটা এমন একটা ক্রাইসিস, যে প্রশাসনকে বুঝতেই হবে। মুখ্যমন্ত্রীকে বুঝতে হবে, উনি একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের মুখ্যমন্ত্রী নন। রোগী-ডাক্তার সকলের মুখ্যমন্ত্রী।" এরপরেই খানিক কড়া ভাষায় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন কৌশিক।
তিনি বলেন, "চিকিৎসা-পরিকাঠামোর কোনও উন্নতি হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ এত ক্লাবকে টাকা না দিয়ে, মেলা না করে, চিকিৎসার পরিকাঠামোর উন্নতি করুন। কারণে-অকারণে যেখানে সেখানে খরচ হয়। প্রয়োজনে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিন। ফিল্ম ফেসটিভ্যালও বাতিল করুন। মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ, আগামী ৫ বছর শিল্পে কোনও খরচ করতে হবে না। বরং চিকিৎসা পরিকাঠামোয় খরচ করুন, উন্নতি করুন।"
একই কথা প্রতিধ্বনিত হল শিল্পী বোলান গঙ্গোপাধ্যায়ের গলাতেও। আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারদের তিনি বলেন, দেশজুড়ে অসম্ভব কঠিন সময় চলছে। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা আরও ভয়াবহ। মাৎস্যন্যায় চলছে রাজ্যে। ডাক্তারদের তিনি সতর্ক করেন, আন্দোলন যেন সম্পূর্ণ তাঁদের নিজস্ব হয়। এখানে যেন কোনও রাজনৈতিক রং না লাগে। এই আন্দোলন যেন কোনওভাবেই এমন কাউকে সাহায্য না করে যা পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে শুভ নয়।
অপর্ণা সেন এবং কৌশিক সেন ছাড়াও এ দিন এনআরএস-এ গিয়েছিলেন সমাজকর্মী বোলান গঙ্গোপাধ্যায় এবং সুরকার দেবোজ্যোতি মিশ্রও। সকলেই সমর্থন জানিয়েছেন ইন্টার্ন এবং জুনিয়র ডাক্তারদের এই আন্দোলনকে। কিন্তু ডাক্তারদের আন্দোলন সমর্থন করা মানেই যে রোগীদের পাশে তাঁরা নেই, তা নয়।
আন্দোলনকারী ডাক্তারদের কাছে কৌশিক সেনের আবেদন, “এমন কোনও ব্যবস্থা নিন যাতে রোগীর কষ্ট কম হয়, অথচ আপনাদের আন্দোলনও চলবে।” একই অনুরোধ জানিয়েছেন অপর্ণা সেন ও বোলান গঙ্গোপাধ্যায়ও।
এনআরএসে না পৌঁছলেও এই আন্দোলনের পক্ষে নিজের গলা তুলেছেন পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ও। স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি লজ্জিত এবং বিরক্ত। জানিয়েছেন জুনিয়র ডাক্তাররা তাঁরই ছাত্রসম, পুত্রসম। তারা ভীত, সন্ত্রস্ত, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে! তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে, এত দিনের চাপা ক্ষোভ ওরা উগরে দিচ্ছে।
"আর কেনই বা দেবে না? হাতে হকি স্টিক নিয়ে এত লোক হাসপাতালে ঢোকার সাহস পায় কী করে? দিনের পর দিন কারও প্রাণ বাঁচানোর সময়ে যদি ভাবতে হয় আমার প্রাণ থাকবে কি না, সেই ভয়ে ভয়ে মানুষের সেবা করা অসম্ভব!"--বলেন তিনি। জানান, নিরাপত্তার পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে প্রশাসনকে।
বস্তুত, গত কয়েক বছর ধরেই এমনটা ঘটে চলেছে! কৌশিক জানান, তিনি আশা করেন যে এই ঘটনার সঙ্গে রাজনীতিকে জড়ানো হবে না। কারণ, তাঁর মতে, এটা একেবারেই রাজনৈতিক ঘটনা নয়। কারও মাথার খুলি তুবড়ে দেওয়া রাজনৈতিক সমস্যা নয়। মানবিক সমস্যা। "পরিবহ মুখোপাধ্যায় তো আমারও ছেলে হতে পারত। আপনারও! তাই নয় কি?"-- আবেদন কৌশিকের।
সাধারণ মানুষ হিসেবে প্রশাসনের কাছে তিনি আবেদন জানান, বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এ বারেও কিছু দায়িত্ববান মানুষ ডাক্তারদের সঙ্গে গিয়ে সরাসরি কথা বলুক।মাথায় রাখতে হবে, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা সুরক্ষিত না হলে একটা রাজ্য মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
তাই চিকিৎসকদের নিরাপত্তাও প্রশাসনের নৈতিক কর্তব্য বলেই মনে করেন কৌশিক। তবে সব শেষে তিনি জানান, সব ডাক্তার বন্ধুদের কাছে তাঁর আবেদন, চিকিৎসকদের ছাড়া অসুস্থ মানুষেরা বড্ড অসহায়। তাই সাধারণ মানুষের ক্ষতির দিকটিও তাঁরা যেন মাথায় রাখেন।