দ্য ওয়াল ব্যুরো: নারীর নিজের শরীরে ওপরে এবং সন্তানের জন্ম দেওয়া বা না-দেওয়ার সিদ্ধান্তের অধিকার আদায়ের লড়াইটা শুরু হয়েছিল অনেকদিনই। দাবি ছিল, গর্ভপাতের অধিকারের সময়সীমা বাড়ানো হোক। সেই দাবিকে মান্যতা দিয়ে তিন দশকের পুরনো আইনে সংশোধনীও (Abortion Law) এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে গর্ভপাত করানোর একটা সুনির্দিষ্ট সময়সীমার বেঁধে দেওয়া হয়েছে নতুন সংশোধনী আইনে। সেই সীমা অতিক্রম করলে কী করণীয় তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র মেডিক্যাল বোর্ডের। সম্প্রতি ৩২ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা এক মহিলা গর্ভপাত করানোর আবেদন নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। হাইকোর্ট মহিলার দাবিকে মান্যতা দিতে রাজি হয়নি, সেক্ষেত্রে বিষয়টা বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্তের ওপরেই ছেড়েছেন বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ।
গর্ভপাতের অধিকার আসলে প্রজনন সংক্রান্ত অধিকার, মাতৃত্বের অধিকার, সন্তানের জন্ম দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের ওপরে একজন মায়ের অধিকার। তবে হ্যাঁ, গর্ভপাত আক্ষরিক অর্থে হল একটি প্রাণের হত্যা। গর্ভস্থ ভ্রূণকে আসলে খুন করারই সিদ্ধান্ত। সেক্ষেত্রে একজন মা ঠিক কোন পরিস্থিতিতে গর্ভপাত করাতে চাইছেন তাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় আইনে। একজন নারী যদি ধর্ষিতা হন, নাবালিকা বা প্রতিবন্ধকতার শিকার হন, তাহলে তাঁর গর্ভপাতের সিদ্ধান্তকে বিবেচনা করা যাবে। গর্ভস্থ ভ্রূণের যদি শারীরিক সমস্যা প্রবল থাকে, জিনগত বা গঠনগত ত্রুটি থাকে, প্রসবের পরে সেই সন্তানের বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয় বা প্রসবের পরে সন্তানের প্রতিবন্ধকতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে, সেইসব ক্ষেত্রেই আইনসঙ্গত গর্ভপাতের কথা ভেবে দেখে আদালত।
গর্ভপাত আইন তিন দশক আগে যা ছিল, এখন তা পরিবর্তিত।
১৯৭১ সালে গর্ভপাত আইন ছিল অন্য
একটা সময় ছিল যখন গর্ভপাতের নাম শুনলেই চোখ কুঁচকে ফেলত সমাজ। অন্যায়ভাবে ভ্রূণ হত্যা কখনওই কাম্য নয়। কিন্তু একজন মা যদি অসহায় হন, শারীরিক বা মানসিক দিক থেকে প্রতিবন্ধকতার শিকার হন, তাহলে গর্ভপাত করানো সঠিক সিদ্ধান্ত কিনা তা বিচারবিবেচনা করে আইনসঙ্গতভাবে সেটি করার জন্যই গর্ভপাত আইন তৈরি হয়। সেই সময় ‘মেডিক্যাল টার্মিনেশন অব প্রেগন্যান্সি’ আইন অনুসারে গর্ভপাতের ঊর্ধ্বসীমা ২০ সপ্তাহে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এর বেশি সময় হয়ে গেলে গর্ভপাত করাতে পারতেন না একজন মা, সে সমস্যা যতই জটিল হোক না কেন। তবে এর ব্যতিক্রমও হয়। আইন পরিবর্তিত হওয়ার আগেই ২২ বছর বয়সী এক তরুণীকে গর্ভাবস্থায় ২৪ সপ্তাহ অতিক্রম করার পরেও গর্ভপাত করানোর অনুমতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। কারণ সেই সন্তান ভূমিষ্ট হলে তাঁর মস্তিষ্কের রোগ ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা হতই। বাঁচার সম্ভাবনাও ছিল কম। জরুরি ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল শীর্ষ আদালত।
একুশে আনা হয় সংশোধনী বিল
২০২১ সালের মার্চে গর্ভপাত আইন (সংশোধনী) পাশ করে সংসদ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় আগেই গর্ভপাতের ঊর্ধ্বসীমা বাড়ানোর প্রস্তাব পেশ হয়েছিল। নয়া আইন অনুযায়ী সময়সীমা ২০ সপ্তাহ থেকে বাড়ানো হয় ২৪ সপ্তাহে।
কী কী বদল আসে আইনে—
গর্ভপাত আইন সংশোধনীতে বলা হয়, শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী প্রসূতি-সহ কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ২৪ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে শারীরিক প্রতিবন্ধী, ধর্ষণের শিকার, নাবালিকা মায়েদের গর্ভপাতের ঊর্ধ্বসীমা বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হবে।
গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাত করাতে হলে একজন চিকিৎসকের মতামত নেওয়া জরুরি এবং গর্ভধারণের পর ২০ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাত করাতে হলে দু’জন চিকিৎসকের মতামত নেওয়া জরুরি।
আত্মীয়-পরিজনের লালসার শিকার, বিশেষ ভাবে সক্ষম মহিলাদের ক্ষেত্রেও গর্ভপাতের একই নিয়ম কার্যকর হবে।
গর্ভস্থ ভ্রূণের জিনগত ত্রুটি থাকলে বা শারীরিক গঠনে কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়লে সেক্ষেত্রে গর্ভপাতের ঊর্ধ্বসীমা বিবেচ্য হবে না। মেডিক্যাল বোর্ডের বিশষজ্ঞরা সেক্ষেত্রে সবদিক খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
যে মহিলার গর্ভপাত করানো হবে তাঁর নাম ও পরিচয় প্রকাশ্যে আনা যাবে না। তবে আইন অনুযায়ী স্বীকৃত ব্যক্তি মহিলার নাম জানতে পারবেন।
গর্ভপাতের ঝুঁকি
গর্ভপাত করানোর সময়সীমা ২০ থেকে ২৪ সপ্তাহই রেখেছে মেডিক্যাল বোর্ড। এর বেশি সময় পেরিয়ে গেলে যদি জরুরি ক্ষেত্রে গর্ভপাত করানোর দরকার পড়ে তাহলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া দরকার। সেক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে মেডিক্যাল বোর্ড তৈরি করে মা ও গর্ভস্থ ভ্রূণে সবদিক খতিয়ে দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে আইনে।
১৪ সপ্তাহের আগে গর্ভপাত করালে অস্ত্রোপচারের দরকার পড়ে না, ওষুধ দিয়ে গর্ভপাত করানো হয়। সেক্ষেত্রে ভ্রূণের কোনও অংশ যাতে জরায়ুতে থেকে না যায় সেটা দেখতে হবে ডাক্তারদের। না হলে, জরায়ুতে ক্ষত, রক্তক্ষরণ, সেপসিস হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সুরক্ষিত গর্ভপাত আবশ্যক। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিকটাও খেয়াল রাখতে হয়।
১৪ সপ্তাহের বেশি হয়ে গেলে ভ্রূণের বৃদ্ধি হতে শুরু করে। তখন অস্ত্রোপচার করাতে হয়। সেক্ষেত্রে সুরক্ষিত গর্ভপাত না হলে ভ্রূণের শরীরের কোনও অংশ জরায়ুতে থেকে গিয়ে সংক্রমণ হতে পারে। হেভি ব্লিডিং, সেপসিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সময় আরও বাড়লে ঝুঁকিও বাড়ে। ২০ থেকে ২৪ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে তখন মা ও সন্তানের শারীরিক দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন ডাক্তাররা। সামান্য অসতর্কতায় মায়ের শরীরেরও ক্ষতি হতে পারে। সংক্রমণ ফ্যালোপিয়ান টিউব ও জরায়ুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরবর্তীকালে মা হওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'