দ্য ওয়াল ব্যুরো, জলপাইগুড়ি: দোলাবৌদিকে মনে পড়ে? পড়েছেন তাঁকে লেখা তাঁর দেওরের চিঠি। ভাবুন তো, সেই চিঠিটা না লিখলে কতবড় শূন্যতা রয়ে যেত বাংলা সাহিত্যে। ঠিকই ধরেছেন, নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’ উপন্যাসের কথাই বলছি। ইংরেজিতে একে বলে এপিস্টোলারি নভেল, বাংলায় পত্রসাহিত্য। তবে এর চেয়ে ভালো উদাহরণও আছে, যাকে বলে সত্যিকারের এপিস্টোলারি নভেল।
এপিস্টোলারি নভেলের মধ্যে এ দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় জেল থেকে মেয়ে ইন্দিরাকে লেখা জওহরলাল নেহরুর চিঠি – লেটার্স ফ্রম এ ফাদার টু হিজ ডটার। আর একটা সময় তো ‘ভালবাসা মানে’ ছিল ‘নীল খামেদের ভেলা’।
চিঠি লেখা শুধু সাহিত্য নয়, শিল্পেরও অঙ্গ, হাতের লেখাটা যে একটা শিল্প! চিঠি লেখার যে ধরন, তাকে ইংরেজিতে বলে এপিস্টোলারি আর্ট। আর্টের বাংলা তর্জমা করলে ‘শিল্প’ই তো হয়।
“সমস্ত প্যাক করাই আছে, এখনো খোলাই হয়নি। তোমার ভাই কলকাতায় এসে কি রকম আছে। তার পড়াশুনোর কি কিছু ঠিক করচ? মাসকাবারী ক মাসের বেরোলো ? আমি হয় ত দিন পনেরো বাদে এখান থেকে যেতে পারব – এখনো বলতে পারিনে।”... এই হল রবীন্দ্রনাথের চিঠির নমুনা। শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন, বিশ্বসাহিত্যে কার্লাইল অমর হয়ে থাকবেন শুধু চিঠি লেখার জন্য। তাঁর চিঠিতেও উঠে আসত পারিপার্শ্বিকতা।
এমন একটা শিল্প নষ্ট হতে চলেছে স্রেফ ইন্টারনেটের জন্য। দোষ দিচ্ছি না, শুধু কারণটা বলছি। হারিয়ে যেতে বসা চিঠিকে পুনরুদ্ধার করতে উদ্যোগী হয়েছে ভারতীয় ডাকবিভাগ। দেশ জুড়ে তারা আয়োজন করেছে চিঠি লেখার প্রতিযোগিতা। চিঠি পাঠাবার শেষ দিন ৩১ শে ডিসেম্বর। চিঠি পাঠানোর ঠিকানা: টু, দ্য চিফ পোস্ট মাস্টার জেনারেল, ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেল, কলকাতা ৭০০০১২।
দু’টি বিভাগে ভাগ করে এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। একটি স্কুল পড়ুয়া স্তর পর্যন্ত ও অন্যটি সাধারণ বিভাগ, যেখানে যে কোনও বয়সের যে কেউ চিঠি লিখতে পারবেন। বিষয় সবার জন্যই একই -- "DEAR BAPU ( MAHATMA GANDHI), YOU ARE IMMORTAL"। এই বিষয়ের উপরে একটি এ-ফোর মাপের সাদা কাগজে পাঁচশো শব্দের মধ্যে চিঠি লিখে পাঠাতে হবে। মহাত্মা গান্ধীর জন্মের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষেই তাঁকে নিয়ে চিঠির আয়োজন।
স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা যদি অনেকে চিঠি লেখে, তা হলে প্রধান শিক্ষক যোগাযোগ করতে পারেন স্থানীয় ডাকঘরে, তাঁরা এসে চিঠি সংগ্রহ করে নিয়ে যাবেন। চিঠি লেখা যাবে ইংরেজি, হিন্দিতে।
জলপাইগুড়ি হেড পোস্ট অফিসের পোস্টম্যান সন্তোষকুমার সোম বলেন, আগে পোস্ট কার্ড ও চিঠি বিলি করতে আমাদের হিমসিম খেতে হত। এখন সেই পোস্ট কার্ড ও ইনল্যান্ড লেটার খুব কম আসে। এখন সরকারি নথিই বেশি আসে। আগে ‘বিট’গুলির প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে আমাদের নিবিড় যোগাযোগ ছিল। স্মার্ট ফোনের ফলে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
জলপাইগুড়ি ডাক বিভাগের সুপারিন্টেন্ডেন্ট সুভাষ ডার্নাল বলেন, “মোবাইল ও ল্যাপটপ বেশি ব্যাবহারের ফলে ছোটদের মধ্যে রাইটিংয়ের বদলে টাইপিংয়ের অভ্যাস বাড়ছে। এর ফলে একই সঙ্গে শুদ্ধ বানান ও সৃজনশীল লেখা -- দুটোই হারিয়ে যাচ্ছে। সে সব ফিরিয়ে আনতেই এই উদ্যোগ।”
ডাকবিভাগ উদ্যোগী হবে নাই বা কেন, তাদেরও তো অবদান বড় কম নয় এই দেশের সাহিত্যে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতা আর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাক হরকরা তো তাঁদের উদ্দেশেই লেখা।