
শেষ আপডেট: 9 August 2021 09:59
গুহ্য তান্ত্রিক সাধনায় মহাবিদ্যা নামে যে দশ দেবীর পূজা করা হয়, ছিন্নমস্তা তাঁদেরই অন্যতম। দেবী সতীর দশমহাবিদ্যা রূপেরও অন্যতম তিনি। দেবীর গায়ের রঙ কখনও জবাফুলের মতো টকটকে লাল, কখনও বা ঘোর অমারাত্রির মতো কালো। পদ্মাসনে নয়, বাঘসিংহের উপরেও নয়, এই ভয়ালদর্শন বিবসনা দেবী দাঁড়িয়ে থাকেন মৈথুনরত একজোড়া দিব্য নারীপুরুষের উপর। মাথা কেটে নিজের রক্ত নিজেই পান করেন দেবী। অথচ এই উগ্রমূর্তি নগ্ন দেবীকেই মাতৃজ্ঞানে পুজো করেন হিন্দুরা। কিন্তু কেন?
হিন্দু শাস্ত্রে নগ্ন, নিষ্ঠুর, রক্তপিপাসু একাধিক দেবী ও দানবীর কথা বলা হলেও তাদের সকলের থেকে আলাদা দেবী ছিন্নমস্তা। তিনি একাধারে নিষ্ঠুর এবং দয়াময়ী। অন্যের খিদের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে নিজের হাতে মাথা কেটে ক্ষুধিতকে রক্ত পান করান তিনি। এমন আশ্চর্য বৈপরীত্য হিন্দুদের আর কোনও দেবীর মধ্যেই দেখা যায়না।
এর কিছুদিন পরেই এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেন দক্ষ। সেই যজ্ঞে ত্রিভুবনের সবার আমন্ত্রণ থাকলেও আমন্ত্রণ পাননি কেবল দক্ষের জামাতা শিব। বাবার এই ব্যবহারে অপমানিত বোধ করেন সতী। তিনি বিনা আমন্ত্রণেই যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে শিবকে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। কিন্তু শত অনুনয়-বিনয়েও রাজি হন না মহাদেব। তখন রাগে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হলে ভীষণ দশ মূর্তি ধারণ করে দশ দিক থেকে শিবকে ঘিরে ধরেন দাক্ষায়ণী। এই দশ মূর্তি বা দশমহাবিদ্যার অন্যতম 'দেবী ছিন্নমস্তা'।
[caption id="attachment_2327900" align="alignnone" width="232"]
দশমহাবিদ্যারূপ[/caption]
ছিন্নমস্তার জন্ম নিয়ে প্রাণতোষিণী তন্ত্র গ্রন্থে প্রচলিত আছে দুটো আলাদা গল্প। তারই একটি কাহিনিতে রয়েছে জয়া-বিজয়া বা ডাকিনী-বর্ণনীর কথা। দেবীর রুদ্ররূপের পাশাপাশি তাঁর মমতাময়ী মাতৃরূপেরও প্রকাশ ঘটেছে এই আশ্চর্য কাহিনিতে। একদিন দুই সখী ডাকিনী ও বর্ণনীকে নিয়ে মন্দাকিনী নদীতে স্নান করতে গেছেন দেবী পার্বতী। নদীতে স্নান সেরেই প্রচণ্ড খিদেয় কাতর হয়ে পড়েন দেবীর দুই সখী। দেবী তাঁদের আশ্বাস দেন বাড়ি ফিরে তাঁদের উপযুক্ত খাবার দেবেন। কিন্তু খিদের জ্বালায় প্রিয় সহচরীদের ছটফট করতে দেখে দেবীর মতে অসীম মমতা জন্মায়। হাতের কাছে কোনও খাবার না থাকায় তিনি নখ দিয়ে নিজের মাথা ছিঁড়ে নিজ রক্ত দিয়েই সঙ্গিনীদের ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন। এই দুই সঙ্গিনী ডাকিনী ও বর্ণনীই দেবী দুর্গার দুই সহচরী জয়া-বিজয়া।
অন্য কাহিনিটিও সমান আকর্ষণীয়। একবার অসুরেরা স্বর্গ আক্রমণ করলে দেবতাদের প্রার্থনা শুনে দেবী পার্বতী চণ্ডিকা রূপ ধরে দৈত্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন। একাহাতে সব অসুর নিধনের পরও ক্রোধন্মত্তা দেবীর রাগ শান্ত হয়নি। রাগে উত্তেজনায় নিজের মাথা কেটে রক্তপান করেন দেবী।
[caption id="attachment_2327907" align="aligncenter" width="600"]
দেবাসুরের যুদ্ধ - প্রাচীন চিত্রকলা[/caption]
দেবীর সেই ভয়ানক রূপ দেখে ভয় পেয়ে দেবতারা দেবী প্রচণ্ডচণ্ডিকার স্তব করলে দেবীর ক্রোধ শান্ত হয়। তিনি আবার বরাভয়া শান্ত রূপে ফিরে যান। ছিন্নমস্তা-সংক্রান্ত কিংবদন্তিগুলির মূল উপজীব্য বিষয় কিন্তু আত্মত্যাগ– কখনও সন্তানের খিদে মেটাতে মায়ের আত্মত্যাগ, কখনও বা জগতের হিতার্থে আত্মত্যাগ। অবশ্য অনেকের মতে, আত্মবিধ্বংসী ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ থেকেও ডালপালা মেলেছে দেবী ছিন্নমস্তার কল্পনা।
বৌদ্ধ দেবী বজ্রযোগিনী[/caption]
বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে দেবী ছিন্নমুণ্ডার দু’টি জন্মবৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। তার একটি কাহিনি অনুসারে, কৃষ্ণাচার্যের শিষ্যা ছিলেন দুই বোন, তাঁদের নাম ছিল মেখলা ও কনখলা। তাঁরা ছিলেন মহাসিদ্ধা। সিদ্ধিলাভের পর গুরুদক্ষিণা দিতে হয়। এই দুই বোন দক্ষিণা হিসাবে নিজেদের মাথা কেটে গুরুকে উৎসর্গ করেন, আর তারপর নৃত্যে রত হন। তাঁদের এই অপূর্ব সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী বজ্রযোগিনীও তখন কবন্ধ রূপে আবির্ভূতা হয়ে তাঁদের সঙ্গে নৃত্যে যোগ দেন। বজ্রযোগিনীর এই কবন্ধ দেবীরূপের নামই ছিন্নমুণ্ডা।
বৌদ্ধ সাধনমালায় আবার এই দেবীর নাম সর্ববুদ্ধা ও এঁর দুই সহচরীর নাম বজ্রবৈরোচনী ও বজ্রবর্ণিনী। এর পাশেই যদি হিন্দু তন্ত্রসার গ্রন্থটি রাখা হয়, দেখা যাবে দেবী ছিন্নমস্তার আরেক নাম সেখানে সর্বসিদ্ধি। তাঁর দুই সহচরীর নাম বর্ণিনী ও ডাকিনী।
অবশ্য প্রকৃতিগতভাবে কিছু অমিলও আছে এই দুই দেবীর। দেবী ছিন্নমস্তার গায়ের রঙ জবাফুলের ন্যায় লাল অথবা কোটিসূর্যের মতো উজ্জ্বল। তাঁর বুকের কাছে ফুটে আছে একটি নীলপদ্ম। গলায় বা কোমরে পেঁচানো রয়েছে নাগযজ্ঞোপবীত। গলদেশে সোনা-মণিমুক্তের অলংকারের সঙ্গেই থাকে নরকরোটি বা ছিন্নমুণ্ডের মালা। দ্বিভুজা দেবীর ডান হাতে ধরা থাকে খাঁড়া বা বাঁকানো তরবারির মতো অস্ত্র। বাম হাতে ধারণ করেন নিজ মুণ্ড। কোনও কোনও মূর্তিতে বামহাতে ধরা থাকে থালা বা নরকপাল, যার উপর নিজমুণ্ড ধারণ করেন দেবী। দেবীর কবন্ধ থেকে বেরিয়ে আসে তিনটি রক্তধারা। বামপাশের ধারাটি পান করেন ডাকিনী। আর ডানপাশের ধারাটি বর্ণনী। মধ্যের মূল ধারাটি কাটা মুণ্ডে নিজেই পান করেন দেবী।
দেবীর যোগিনী সহচরী দুজনই নগ্না, খোলাচুল বা জটাজুটধারিণী, ত্রিনয়না, পীনোন্নত-পয়োধরা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিণী। তাঁদের বাম হাতে নরকপাল আর ডান হাতে কাতরি জাতীয় অস্ত্র। বামে ডাকিনী, তিনি কৃষ্ণবর্ণা, তমোগুণের প্রতীক। আর ডানদিকে বর্ণনী রক্তবর্ণা, তিনি রজোগুণের প্রতীক। দেবীর পায়ের নীচে সঙ্গমরত অবস্থায় শুয়ে থাজা কিন্নর যুগল বা কাম-রতি। দেবীর দক্ষিণ পা দিয়ে যেন কামদলন করছেন। বৌদ্ধ দেবী ছিন্নমুণ্ডাও বাঁহাতে নিজের কাটা মুণ্ড ধরে আছেন বটে, কিন্তু রক্তপান করছেন না। নৃত্যরত দেবীর দুপাশে নাচের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন মেখলা ও কঙখলা। তাঁদের পায়ের নীচে মৈথুনরত যুগল থাকে না। দেবীর শরীরে নরমুণ্ডমালা বা যজ্ঞোপবীতও নেই।
[caption id="attachment_2327910" align="aligncenter" width="442"]
'ছিন্নমুণ্ডা' বজ্রযোগিনী- তান্ত্রিক বৌদ্ধ দেবী[/caption]
এসব অমিল সত্ত্বেও বিনয়তোষ ভট্টাচার্য, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের মতো লেখকেরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন বজ্রযোগিনীর এই সর্ববুদ্ধা বা ছিন্নমুণ্ডা রূপ থেকেই হিন্দু দেবী ছিন্নমস্তার জন্ম।
মূলত তান্ত্রিক দেবী হিসাবে প্রসিদ্ধ হওয়ায় গৃহী ভক্তেরা দেবী ছিন্নমস্তার পুজো করতে পারেন না। তাছাড়া দেবীর ভীষণা প্রকৃতির জন্যও সাধারণ মানুষ তাঁর পুজো করতে ভয় পান। তান্ত্রিক, যোগী আর সিদ্ধপুরুষেরাই কেবল বীরাচারী তান্ত্রিকমতে দেবীর পূজা করে থাকেন। ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে দেবী ছিন্নমস্তার একাধিক মন্দির। তবে এর কোনওটিই সপ্তদশ শতাব্দীর আগে তৈরি নয়। হিমাচলে চিন্তাপূর্ণী ছিন্নমস্তা মন্দির একটি বিখ্যাত শক্তিপীঠ। কথিত আছে, বিষ্ণুর সুদর্শনের আঘাতে সতীর দেহ যখন ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তখন এই অঞ্চলে দেবীর কপাল পড়েছিল। দেবী এই মন্দিরে ছিন্নমস্তিকা এবং কপাল নামে পূজিতা হন।
[caption id="attachment_2327914" align="aligncenter" width="600"]
সতীপীঠ চিন্তাপূর্ণী [/caption]
বেনারসের কাছে রামনগর অঞ্চলেও রয়েছে একটি প্রাচীন ছিন্নমস্তা মন্দির। শোনা যায়, এই মন্দিরে তান্ত্রিকেরা শবদেহ নিয়ে দেবীর পূজা করেন। ঝাড়খণ্ডের দেওঘরের শিবতীর্থ বৈদ্যনাথ মন্দিরের কাছে নন্দন পর্বতেও আছে ছিন্নমস্তার মন্দির। অসমের কামাখ্যা মন্দির চত্বরেও অন্যান্য মহাবিদ্যার সঙ্গে ছিন্নমস্তার বেদী বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর শহরে একটি বিখ্যাত ছিন্নমস্তা মন্দির রয়েছে। ভারতের বাইরে প্রতিবেশী দেশ নেপালের কাঠমাণ্ডু উপত্যকায় চাঙ্গু নারায়ণ মন্দিরের কাছে একটি ছিন্নমস্তা মন্দির রয়েছে। তবে দেবী ছিন্নমস্তার সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দিরটি কিন্তু রয়েছে ঘরের কাছেই, ঝাড়খণ্ডের রাজারাপ্পায়।
প্রাচীন এই মন্দিরটির সঙ্গে একটা অন্যরকম ইমোশনও জড়িয়ে আছে বাঙালির। এই মন্দিরের পটভূমিকাতেই সত্যজিৎ রায় গড়ে তুলেছিলেন গাছমছমে এক রহস্যকাহিনি। 'ছিন্নমস্তার অভিশাপ' পড়েননি এমন বাঙালি আজও হাতেগোনা। সেই বিখ্যাত ফেলুদাকাহিনির যাবতীয় ঘনঘটা সবটাই তো রাজারাপ্পার এই বিখ্যাত মন্দিরকে কেন্দ্র করে।
এক দিকে দামোদর, আর এক দিকে বইছে ভৈরবী নদী। স্থানীয়দের মুখে মুখে তার নাম ভেরা নদী।একটি অনুচ্চ পাহাড় থেকে সেই ভৈরবী নদী আছড়ে পড়েছে দামোদর নদের বুকে। ভৈরবী নদীকে নারী আর দামোদর নদকে পুরুষ মনে করলে নদ ও নদী অথবা নারী-পুরুষের সেই চির সঙ্গম হচ্ছে এই স্থানটিতে। সেই সঙ্গমস্থলে এক অনুচ্চ টিলার টঙে ছিন্নমস্তা দেবীর মন্দির। মায়ের পূজার প্রধান অর্ঘ্য নারকেল, প্যাঁড়া, চিঁড়ে, নকুলদানা, জবার মালা ইত্যাদি। যে কোনো শাক্তপীঠ বা সিদ্ধপীঠের মতো এখানেও বলিপ্রথা চালু আছে আজও। ভক্তরা মানসপূরণে মায়ের কাছে ছাগবলি দিয়ে থাকেন।
আর এই রাজারাপ্পা মন্দিরের পটভূমিকাতেই লেখা হয় সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ফেলুদা-কাহিনি ছিন্নমস্তার অভিশাপ। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে দেখা যায় হাজারিবাগে ছুটি কাটাতে গিয়ে ফেলুদা-তপসে-লালমোহনবাবু জড়িয়ে পড়েন এক আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায়। রাজারাপ্পায় পিকনিক করতে গিয়ে আচমকা মারা যান হাজারিবাগের বিখ্যাত আইনজীবী মহেশবাবু। আর সেই মৃত্যুরহস্যের কিনারা করতেই এগিয়ে আসেন গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্র আর তাঁর দলবল। নিছক প্রেক্ষাপট নয়, টানটান রহস্যে ঘেরা এই ফেলুকাহিনির এক অন্যতম চরিত্র হয়ে উঠেছে ভেড়ানদীর তীরবর্তী রাজারাপ্পার শতাব্দীপ্রাচীন ছিন্নমস্তা দেবীর মন্দির।
[caption id="attachment_2329428" align="aligncenter" width="294"]
ছিন্নমস্তার অভিশাপ- ইলাস্টেশন[/caption]
আপনি যদি শক্তিসাধক না হন, এমনকি ফেলুদা-কাহিনির একনিষ্ঠ পাঠকও নন, তাহলেও নিছক প্রকৃতির টানে ঘুরে আসতে পারেন রাজারাপ্পা। নদী, পাথর, প্রকৃতিতে ঘেরা এই অঞ্চলের অসামান্য সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে প্রকৃতিপাগল অভিযাত্রীকদের। বসন্তের পরে গেলে চোখে পড়বে লালে লাল পলাশের দিগন্তবিস্তৃত সৌন্দর্য।
[caption id="attachment_2329424" align="aligncenter" width="600"]
রাজারাপ্পা ফলস[/caption]