
শেষ আপডেট: 26 September 2019 18:30
নিয়মে বদল এল। প্রত্যাশিত ভাবেই। জাত-ধর্মের ঠুনকো বিশ্বাস ভেঙে, দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে বড় হল মূল্যবোধ। তৎকালীন সংস্কারবদ্ধ বাঙালি সমাজে ব্যতিক্রমী ভাবনার দৃষ্টান্ত রাখল বালির বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার।
বদলটা এল পুজোর মাঝেই। বোধন সেরে উমাকে ঘরে তোলা হয়েছে। ষষ্ঠী পেরিয়ে সপ্তমীর সকাল। নবপত্রিকা স্নানের তোড়জোড় চলছে। এই বাড়ির রীতি, গঙ্গায় গিয়ে নয় ঠাকুরদালানেই গঙ্গা জলে স্নান করানো হবে কলাবউকে। বাড়ির মেয়েরা তখনও অবগুন্ঠনের আড়ালে। বাড়ির চৌকাঠ পাড়া করার আদেশ নেই। কাজেই যা হবে চৌহদ্দির মধ্যেই। গঙ্গা জলের ঘটি তুলে ধরতেই বাধ সাধলেন জগৎচন্দ্র। শুধু গঙ্গা জল কেন? নবপত্রিকার অঞ্জলি হবে বিশ্বের নানা দেশের নদীর জলে। সংস্কারের গোঁড়ামি ভেঙে বাংলার প্রাণের পুজো সিঞ্চিত হবে আরও অনেক মনে। আত্মীয়-অনাত্মীয়দের অবাক করে দিয়ে সে দিন নবপত্রিকা স্নান করানো হয় গঙ্গা ও টেমস নদীর জলে। সেই শুরু। বংশানুক্রমিক ভাবে কখনও টেমস, কখনও মিশরের নীল নদ বা চিনের হোয়াংফু নদীর জলে কলাবউ স্নান করানোর রীতি চলে আসছে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে।
খাস ইংরেজ আমলের সংস্কারবদ্ধ বনেদিয়ানায় যে অন্য রকম ভাবনার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছিলেন জগৎচন্দ্র, আজ সেটাই বালির বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজোর সেরা আকর্ষণ। সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নান দেখতে ঠাকুরদালানে ভিড় জমান বহু মানুষ। গঙ্গার জলের সঙ্গে যখন টেমস আর নীল নদের জল মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়, উলুধ্বনি দিয়ে ওঠেন বাড়ির মহিলারা। শারদ ভোরে চণ্ডীপাঠের মন্ত্রের সঙ্গে কোথায় যেন এক হয়ে যায় বাংলা, লন্ডন, মিশর।
বাড়ির পুজোর ভার এখন আইনজীবী অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ভাই দেবমাল্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাঁধে। অশোকবাবু বলেছেন, “ ১৫৫ বছরের পুরনো পুজো। আমাদের বাড়ি থেকে কয়েক কদম হাঁটলেই গঙ্গা। তবে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গিয়ে কলাবউ স্নান করানোর রীতি নেই। প্রাচীন নিয়ম মেনে এখনও বাড়ির ঠাকুরদালানেই নবপত্রিকা স্নান হয়। আর গঙ্গা জলের সঙ্গে দরকার হয় নানা দেশের নদীর জল।”কর্মসূত্রে বা পড়াশোনার জন্য বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির অনেক সদস্যই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন বিশ্বের নানা দেশে। অশোক বাবু জানালেন, পুজোয় সকলকে বাড়ি ফিরতেই হয়। যে যেখানেই থাকুক, দায়িত্ব নিয়ে সেখানকার নদীর জল নিয়ে আসেন। অশোক বাবুর কথায়, “আমি নিজেও বছরে অনেকবার বিদেশে যাই। তাই জল পেতে অসুবিধা হয় না। গঙ্গা জলের মতো টেমস নদীর জল বাড়িতেই জমা করা থাকে।”
পুজো হয় পুরোপুরি বৈষ্ণব মতে। পশু বলির ব্যাপার নেই। চাল, কুমড়ো, শশা, আখ এই সবই বলি হয়। ভোগের থালাতেও তাই নিরামিষের আয়োজন। সপ্তমী থেকে নবমী পাত পেড়ে খাওয়ানো হয় বাড়ির আত্মীয় থেকে অনাত্মীয়দের। শেষ পাতে নানা রকম মিষ্টির চল রয়েছে। নিজের হাতে ভোগ বেড়ে দেন বাড়ির মহিলারা।
অশোক বাবু জানিয়েছেন, জন্মাষ্টমীর দিনেই কাঠামো পুজো হয়ে যায়। একচালের প্রতিমার আগে মাটির সাজ ছিল। এখন সোনার সাজ। আরও একটা বৈশিষ্ট্য আছে এই পুজোর। বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে কাঁধে চেপে বিসর্জনে যান দুর্গা। বাড়ির মেয়ে উমাকে কাঁধে চাপিয়েই গঙ্গায় নিয়ে যাওয়ার রীতি চালু করেছিলেন জগৎচন্দ্রই।
