
শেষ আপডেট: 23 September 2019 18:30
প্রাচীন পুজো। ঐতিহ্যের পুজো। এই পুজোয় বাগবাজারের ডাকের সাজ নেই, তিলোত্তমার আলোর কারুকাজ নেই, তবে যেটা আছে সেটা হল শিকড়ের টান। নস্ট্যালজিয়াকে শিরায় শিরায় অনুভব করার শিহরণ। নিজের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অদম্য প্রয়াস এবং অবশ্যই বুক ভরা আন্তরিকতা। এই সব কিছু নিয়েই সাড়ে ৩০০ বছর ধরে সাবেকিয়ানাকে টিকিয়ে রেখেছে মালদার হরিশ্চন্দ্রপুরের জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো। এই পুজোর আরেকটা পরিচয়ও আছে। ভূমি ব্যান্ডের জনপ্রিয় গায়ক সৌমিত্র রায়ের বাড়ির পুজো নামেও গ্রামবাসীদের কাছে রায় বাড়ির দুর্গাপুজো বেশ জনপ্রিয়।
সৌমিত্র রায় যখন বাড়ির সদস্য, তখন পুজোতে গানবাজনার যে বিশেষ চল থাকবে সেটা বলাই বাহুল্য। ইদানীং কয়েক বছর অবশ্য বাড়ির পুজোতে সে ভাবে থাকতে পারেন না সৌমিত্র। তবে তিনি বলেছেন, পুজোর চারদিন উৎসব-অনুষ্ঠানের কোনও কমতি থাকে না হরিশ্চন্দ্রপুরের জমিদার বাড়িতে। দশমীর সন্ধ্যায় সিঁদুর খেলা জমে ওঠে ভূমির গানে। ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা’ গানের সুরে সঙ্গত করে ঢাকের বোল। আধুনিক গান একাকার হয়ে যায় আগমনীর সুরে।
চাঁচোল মহকুমার এই হরিশ্চন্দ্রপুর জমিদার বাড়ির পুজো প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরের পুরনো। রায় পরিবারের সদস্যেরা বলেন, শুরুটা হয়েছিল হরিশ্চন্দ্রপুরের ভিঙ্গল গ্রাম থেকে। মাটি মূর্তি গড়ে পুজো শুরু করেছিলেন জমিদার ভজমোহন রায়। এই রায় পরিবারেরই আরেকটি পুজো প্রচলিত আছে বারদুয়ারী গ্রামে। যে পুজো শুরু করেছিলেন জমিদার তরুণ রায়। পুজোর দুটো ভাগ হলেও, সাবেকিয়ানায় কোনও খামতি নেই। সৌমিত্র রায়ের পরিবারের দিকে অর্থাৎ বড় তরফের পুজোর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। পুজোর চারদিনই চণ্ডীপাঠ হয়। এই রীতি শুরু করেছিলেন জমিদার পিনাকী রঞ্জন রায়। তিনি পেশায় ডাক্তার ছিলেন। পুজোর চারদিন নিজেই চণ্ডীপাঠ করতেন। এখন অবশ্য সেই ভূমিকা কেউ নিতে পারেন না। তাই পিনাকী রঞ্জনের রেকর্ড করা কণ্ঠস্বরই বাজানো হয় পুজোর চারদিন।
বৈষ্ণব মতে পুজোর রীতি রায় বাড়িতে। রায় বাড়িতে বহুকাল পুজো করছেন সঞ্জীব ওঝা। বললেন, “প্রাচীন রীতির কোনও বদল হয়নি। পুজোর নিয়মে সেই শত বছরের পুরনো প্রথাই মেনে আসছে পরিবার। দশমীর সন্ধ্যায় ঘট বিসর্জনের পরে আগে কীর্তন, যাত্রা হত বাড়িতে। কীর্তনটা এখনও হয়, তবে আধুনিক গানও বেশ পছন্দ করে বাড়ির লোকজন এবং গ্রামবাসীরা।”
গত বছর বিদেশে প্রোগ্রামে ছিল, তাই বাড়ির পুজোতে যাওয়া হয়নি সৌমিত্র রায়ের। বলেছেন, “শিকড়ের টান এড়ানো বড় কঠিন। বছরের অন্যান্য সময় গ্রামের বাড়িতে ঘুরে আসি, তবে পুজোর চারদিন দেশে-বিদেশের নানা জায়গায় ঠাসা অনুষ্ঠান থাকে। যেতে পারি না। তবে বাড়ির পুজো বড় টানে আমাকে। মনে পড়ে বিজয়া-উৎসবের কথা। আত্মীয়, বন্ধু সকলে মিলে নাচ-গানে মেতে ওঠার সেই মুহূর্ত বিদেশের মাটিতে কোথায়!“
