
শেষ আপডেট: 5 January 2023 17:18
গত বছর এপ্রিল মাসে কেরলের কান্নুরে সিপিএমের (CPM) পার্টি কংগ্রেস তথা সর্বভারতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে পার্টির গঠনতন্ত্রে নতুন একটি ধারা যোগ করেছে সিপিএম। লক্ষ্মী সায়গলের পার্টি দলের সংবিধানে লিখেছে, দলের কোনও পুরুষ সদস্য যদি কোনও মহিলার উপর শারীরিক নির্যাতন করেন তা যৌন নিগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু আরএকটা এপ্রিল আসার আগেই বাংলা সিপিএমের অভ্যন্তরে নারী নিগ্রহ (women harassment) যেন সংক্রমণের আকার নিচ্ছে। জেলায় জেলায় দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে মহিলাদের হেনস্থা করার। কোথাও তা যৌন হেনস্থা। কোথাও মারধর।
এ ব্যাপারে এখন সিপিএমের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে টালিগঞ্জ-২ এরিয়া কমিটির কথা। সেখানকার এক যুবনেতার কীর্তিতে কার্যত তটস্থ দলেরই যুবতী ও মহিলা কর্মীরা।
সিপিএম সূত্রে খবর, ২০২১ সালের পুজোয় টালিগঞ্জ-২ এরিয়া কমিটি এলাকার যুবনেতা সোমনাথ ঝাঁ এক যুবতীকে পরপর তিনদিন মারধর করেছিলেন। কখনও তা এলাকায় আবার কখনও নাকি বাইকে চাপিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে বারুইপুর বাইপাসের কাছে।
এবার আসা যাক কী ভাবে মারধর হয়েছিল তাঁকে? অর্থাৎ নিগ্রহের প্রকৃতি কেমন ছিল?
ওই যুবতীও সিপিএম করেন। তিনি দলে লিখিতভাবে অভিযোগ জানিয়েছেন সোমনাথের বিরুদ্ধে। পুলিশের কাছে না গিয়ে দলের উপরেই আস্থা রেখেছিলেন তিনি। সিপিএমের এক নেতা বলেন, ‘আক্রান্ত’ যুবতী তাঁর লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, কখনও হেলমেট দিয়ে পিটিয়ে তাঁর বাঁ চোখের নীচের অংশে কালশিটে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। আবার হাতের আঙুলের নখের উপর ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করে থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন এই ঘটনা ঘটল?
জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত যুবকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল ওই যুবতীর। কিছু কারণে দু’জনের দূরত্ব তৈরি হয়। ফলস্বরূপ এই পর্যায়ে হিংসার ঘটিনা ঘটে বলে সিপিএম সূত্রে খবর।
এরপর কলকাতা জেলা সিপিএম তদন্ত কমিশন গঠন করে। অভিযুক্তকে একবছর সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবন। তারপর তা যায় রাজ্য কমিটির অনুমোদনের জন্য। রাজ্য কমিটির বৈঠকে সোমনাথ ঝাঁকে এক বছরের জন্য সাসপেনশনে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সিপিএমের নিয়ম হল, কাউকে যদি শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে সাসপেন্ড করা হয় তাহলে তা এলাকায় সাধারণ সভা করে পার্টি সদস্যেদের জানিয়ে দেওয়া হয়। এখন অভিযোগ উঠছে, দলের একাংশের নেতা এই রাষ্ট্র হওয়াটা আটকাতে চাইছেন। অর্থাৎ সাধারণ সভা বা সার্কুলার দিয়ে দলীয় সদস্যদের জানাতে চাইছেন না টালিগঞ্জের ক্ষমতাসীন সিপিএম নেতারা। এতে জেলা নেতাদের একাংশের ইন্ধন আছে বলেও অভিযোগ করছেন কেউ কেউ।
টালিগঞ্জের সিপিএমের এক যুবতী কর্মী বলেন, ‘ওই ছেলেটি মিছিলে হাঁটলে আমার মিছিলে যেতে ভয় লাগে। এও অবাক লাগে, এ হেন ঘৃণ্য অপরাধের পর তাকে দল পুষে রেখেছে।’
এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য সোমনাথ ঝাঁকে দ্য ওয়ালের পক্ষ থেকে ফোন করা হয়েছিল। তিনি ঘটনাটাই অস্বীকার করেন। দ্য ওয়ালকে সোমনাথ বলেন, ‘আমি তো এমন কিছু জানি না।’ তাঁকে যে দল সাসপেন্ড করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে যে এই ধরনের অভিযোগ উঠেছে সেটাও তিনি জানেন না বলে দাবি করেছেন সোমনাথ।
দ্য ওয়ালের পক্ষ থেকে ফোন করা হয়েছিল সিপিএমের টালিগঞ্জ-২ এরিয়া কমিটির সম্পাদক পিনাক দাস ওরফে ববিনকেও। গোটা বিষয়টি শুনে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনাদের কে বলেছে?’ তাঁকে জানানো হয়, সাংবাদিকতার গোড়ার মূল্যবোধ মেনেই সূত্র প্রকাশ করতে অপারগ। এরপর তিনি বলেন, ‘পার্টির অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আমি আলোচনা করব না।’
সোমনাথ ঝাঁ যেভাবে অবাক হয়েছিলেন, পিনাক দাস তা হননি। অস্বীকারও করেননি। তিনি সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন, পার্টির অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কিছু বলবেন না। বিপ্লবী গোপনীয়তা বজায় রাখবেন।
যিনি আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ, তিনি যদি দলে না অভিযোগ করে থানা পুলিশ করতেন তাহলে কী হতো?
এ ব্যাপারে আইনজীবী আশিষ কুমার চৌধুরী বলেন, ‘আঘাতের ধরন দেখে ধারা ঠিক হয়। এক্ষেত্রে কী ধরনের আঘাত ছিল তা গুরুত্বপূর্ণ।’ সিপিএম সূত্রে ওই যুবতীর যে ধরনের আঘাতের কথা জানা গিয়েছে তা বলা হয় আইনজীবীকে। শুনে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের ক্ষেত্রে অবশ্যই ৩০৭ ধারা যোগ হতে পারত। অর্থাৎ অ্যাটেম্পট টু মার্ডার। খুনের চেষ্টার ধারায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হতে পারত।’
এ ব্যাপারে অধ্যাপক তথা সমাজকর্মী শাশ্বতী ঘোষ বলেন, "প্রকাশ্যে যদি কোনও মহিলাকে এইভাবে পেটানোর পর অভিযুক্তকে এক বছর সাসপেন্ড করা হয় এর থেকে নিন্দাজনক আর কিছু হতে পারে না।" তিনি আরও বলেন, "সিপিএম যখন নতুন একটা ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছে, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, সায়রা শাহ হালিমের মতো মহিলাদের সামনের সারিতে এগিয়ে দিচ্ছে সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই ঘটনা আরও নিন্দাজনক।"
সিপিএমের অনেক নেতাই উদ্বেগের মধ্যে পড়েছেন এই ধরনের ঘটনার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে। ঘরোয়া আলোচনায় সে ব্যাপারে তাঁরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার কথা গোপন করছেন না। সিপিএম সূত্রে জানা গিয়েছে, মধ্য যাদবপুর এলাকায় এক ছাত্র নেতাও যৌন নিগ্রহের ঘটনা ঘটিয়েছেন। তিনিও শাস্তির মুখে পড়েছেন বলে খবর। পানিহাটি এলাকার এক সিপিএম নেতা তথা উত্তর ২৪ পরগনা জেলার এক শিক্ষক নেতার বিরুদ্ধেও এই ধরনের অভিযোগ নিয়ে কমিশন চলছে বলে জানা গিয়েছে।