দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোটের আগে উত্তরবঙ্গে বিজেপির প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর একটি নাম নিয়ে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন। জনে জনে জানতে চান, কে এই অশোক লাহিড়ি? মুখচেনা তো নয়ই, নামও শুনেছেন হাতেগোনা কিছু মানুষ। প্রথমে আলিপুরদুয়ার, পরে বালুরঘাট থেকে প্রার্থী করা হয় তাঁকে। সেখান থেকে জিতে প্রথমবার বিধানসভায় পা রেখেছেন। বৃহস্পতিবার প্রথম বিধানসভায় বিতর্কে অংশ নিয়ে পরিষদীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি হল তাঁর।। পয়লা দিনেই ছাপ রাখলেন ভাষণে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলেন শাসক ও বিরোধী দুই শিবিরের বিধায়কেরাই। বিজেপির তালিকায় তিনিই ছিলেন প্রথম বক্তা। সমালোচনার পাশাপাশি দিলেন পরামর্শও।
অশোক লাহিড়ীর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার তালিকা দীর্ঘ। দীর্ঘসময় ছিলেন ভারত সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। ওই পদে অনেকেই নজরকাড়া ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু অশোকের ওই পদে থাকার সময়কালটা তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০২ থেকে ২০০৭, অর্থাৎ অটলবিহারী বাজপেয়ি এবং মনমোহন সিং, রাজনীতির ভিন্ন মেরুর দুই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শদাতার কাজ করেছেন। ২০০৪-এ বিদায় নেয় অটল বিহারী বাজপেয়ির এনডিএ সরকার। শুধু সম্মানজনক ওই পদেই নয়, বিশ্বব্যাঙ্কের পরামর্শদাতা, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ এন্ড পলিসি ডিরেক্টর, দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিক্স রিডার পদে। সবশেষে ছিলেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান। ছিলেন বন্ধন ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যানও।
বৃহস্পতিবার থেকে বিধানসভায় রাজ্য বাজেটের উপর বিতর্ক শুরু হয়েছে। তাতে অংশ নিয়ে অশোক বলেন, বাজেটের পরিস়খ্যানের সংশোধন প্রয়োজন। তা সংশোধন না করে বাজেট পাশ করালে তা হবে অনৈতিক। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-’২০ আর্থিক বছরে বাংলার উন্নয়ন বৃদ্ধির হার জাতীয় হারের থেকে বেশি ছিল। এটা সত্য। কিন্তু ২০১২ থেকে বাংলায় বৃদ্ধির হার লাগাতার কম। আমি চাই বাংলা অগ্রণী হোক। কিন্তু এটা সত্য পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে পড়েছে। রাজ্যের উন্নয়ন থমকে যাচ্ছে।
অমিত মিত্রর তৈরি বাজেটের সমালোচনা করে বলেন ২০২১-২২ আর্থিক বছরের সঙ্গে ২০১৮-’১৯ এর তথ্যও থাকা উচিত ছিল। সেই সঙ্গে যোগ করেন, জনগণকে বাজেট নিয়ে বিভ্রান্ত করছে, এই বলে আমি আমার সহকর্মীকে ছোট করতে পারি না। আশা করি সংশোধন করবেন। অশোক আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গে ‘শ্রী’ শব্দ জুড়ে অনেক প্রকল্প নিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে আমি ৪৭টি পেয়েছি। এর জন্য অভিনন্দন জানাব। এতগুলো প্রকল্প কীভাবে চালাচ্ছেন এর মধ্যে কতগুলি কেন্দ্র চালাচ্ছে কতগুলি যৌথ ভাবে চলছে? প্রকল্প রুপায়ণে সর্বত্র সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রয়োজনে ভিন রাজ্যে যাওয়া, পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যা সবই ছিল তাঁর ভাষণে। সরকারকে তাঁর পরামর্শ আয় বাড়িয়ে উন্নয়ন খাতে আরও অর্থ ব্যয় করতে হবে।
সরব হন দূর্নীতি নিয়েও। তিনি বলেন, দুর্নীতির প্রকোপ থেকে আজও আমরা মুক্ত নই। কারা পাচ্ছেন, কারা পাবেন, কারা পেয়েছেন তার তালিকা প্রকাশ করুন। রাজ্যের ঘাড়ে থাকা ঋণের বোঝা নিয়ে বলেন, এর থেকে পরিত্রাণ দরকার। এরপর জাতীয় সড়কের হাল, স্বাস্থ্য ও কৃষির সমস্যা, টিকাকরণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে মুখ খোলেন বিজেপির এই নব নির্বাচিত বিধায়ক।
বিধানসভা ভোটে বিজেপি কাউকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে তুলে ধরেনি। তবে দলীয় মহলে অনেকগুলি নাম ঘোরাফেরা করছিল। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের একটি ভাবনা ছিল বাংলায় দল ক্ষমতা দখল করতে পারলে পেশাদার রাজনীতিবিদ নন, রাজনীতির বাইরের কোনও দক্ষ প্রশাসককে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে। আর একটি ভাবনা ছিল, মুখ্যমন্ত্রী পদে রাজনীতির লোককে বসিয়ে অর্থমন্ত্রীর চেয়ারে বসানো হবে অভিজ্ঞ কোনও প্রশাসককে। এই দুই ভাবনাতেই আলোচ্য নামের তালিকায় ছিল অশোকের নাম।
বিধানসভা ভোটের প্রচারে বিজেপি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল বাংলার আর্থিক হাল ফেরানোর বিষয়ে। সেই কারণেই সরকারি ব্যবস্থার অর্থ-প্রশাসন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি হিসাবেই বছর সত্তরের অশোককে নিরাপদ আসন থেকে প্রার্থী করেছিল তারা। যেমন তাঁরই মতো প্রেসিডেন্সির আর এক প্রাক্তনী অমিত মিত্রকে ২০১১-র ভোটের আগে রাজনীতিতে নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অশোকের মতো অমিতও রাজনীতিতে আসার আগে ভারত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রকের উপদেষ্টার পদ সামলেছেন। ছিলেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহু প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে।
বিজেপি সূত্রের খবর, ক্ষমতায় আসছে ধরে নিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাংলায় সরকার পরিচালনার যে টিম ঠিক করেছিল তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমিত মিত্র-কে বেছে নেওয়ার দৃষ্টান্তকে অনুসরণ করেছিল গেরুয়া শিবির। তারা ক্ষমতায় এলে অশোক লাহিড়ি হয়তো অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু এ যাত্রায় তা সম্ভব হয়নি। অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রর বাজেট ভাষণের উপর বিতর্কে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হল অর্থনীতির আর এক পণ্ডিত অশোক লাহিড়ির পরিষদীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি।