
শেষ আপডেট: 14 July 2023 12:41
কলকাতার অদূরে মিনাখাঁয় এক ব্যক্তি দুবাইয়ে বসে পঞ্চায়েত ভোটে (panchayat election) মনোনয়নপত্র পেশ করেছিলেন। আদালতের নির্দেশ তা বাতিল হয়েছে। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার তথা বিডিও-র নজর এড়িয়ে কী করে এটা সম্ভব হল সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি। বিডিও অর্থাৎ ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসারের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।(Allegation of favouritism)
উলুবেড়িয়ায় বিডিও-র বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও গুরুতর। সিপিএম প্রার্থীর মনোনয়ন পত্রের তথ্য কালি দিয়ে মুছে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিডিও-র (bdo) বিরুদ্ধে (Allegation of favouritism) । আদালত প্রথমে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। পরে রাজ্য পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। মুর্শিদাবাদে এক বিডিও-র বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ভোট গ্রহণের পর ব্যালট বাক্স অদলবদল করেছেন।
এগুলি সংবাদমাধ্যমে আসা কিছু দৃষ্টান্ত মাত্র। এবার পঞ্চায়েত নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন, পুলিশের পাশাপাশি বিডিও-দেরও ভিলেনের তালিকায় রাখছে বিরোধী দলগুলি। শুধু বিরোধী দলই নয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের একাংশেরও মত, অতীতে পঞ্চায়েত ভোটে বিডিও-দের বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ ওঠেনি। এবারের মতো এত বেশি অভিযোগও শোনা যায়নি। যদিও আগের ভোটগুলিতেও জেলা প্রশাসনের এই সর্বনিম্ন স্তরের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, শাসক দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠত।
এবারের অভিযোগ এবং অভিযোগের বহর নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই সূত্রে বিডিও’দের নিয়ে চর্চাও শুরু হয়েছে। রাজ্য প্রশাসনের সবচেয়ে নিচুস্তরে কর্মরত এই আধিকারিকদের বলা হয় সরকারের চোখ-কান-নাক। একেবারে তৃণমূল স্তরে পুলিশ বাদে সাধারণ প্রশাসনের আরও কোনও আধিকারিক কাজ করেন না।
সরকারের প্রকল্প রূপায়ণ, মানুষের অভাব-অভিযোগ শোনা, ঘটনা-দুর্ঘটনায় প্রথম ছুটে যাওয়ার কাজটা থানার ওসি-আইসি’দের পাশাপাশি বিডিও’রাও করে থাকেন। আর তা করতে গিয়ে অনেক সময়ই মানুষের রোষের মুখে পড়তে হয় তাদের। রাজ্য সিভিল সার্ভিসের মতো কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এমন চাকরিতে যোগ দিয়ে অনেকে অল্পদিনে ছাড়তে বাধ্য হন। সব রাজ্যেই মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য রাজ্যে ভাল সরকারি চাকরি বলতে স্টেট সিভিল সার্ভিসই।
সেই কঠিন পরীক্ষা পেরিয়ে চাকরিতে যোগ দিয়ে নেতা থেকে জনতা সকলের মুখ ঝামটা খাওয়া অনেকেরই হজম হয় না। বাম জমানার গোড়ায় বিডিও’দের তাই খানিক মজা করেই বলা হত ‘বড় দুঃখের অফিসার’ (বিডিও)। যদিও ওই পদে কর্মরত অফিসারেরাও নিজেদের তাই-ই মনে করতেন। তবে সব জমানাই রূপ বদলায়। বাম জমানায় গোড়ায় শাসক দলের শাসানি মুখ বুজে সইতে হলেও ক্রমে বিডিও’দের বামফ্রন্টের পরম বন্ধু বলে কটাক্ষ করত বিরোধীরা। শুধু বিডিও’রাই নন, ডব্লুবিসিএস এক্সিকিউটিভদের সংগঠনের সঙ্গেও বিগত সরকারের মধুর সম্পর্ক ছিল।
তৃণমূল জমানায় মমতা বন্দ্যোপাধায় প্রথম থেকেই বিডিও’দের প্রশাসনিক মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টা করেছেন। বাড়তি দায়িত্বের পাশাপাশি আর্থিক সুযোগ-সুবিধাও বৃদ্ধি করেছেন যথেষ্ট।
পাশাপাশি প্রয়োজনে মুখ্যমন্ত্রী এই অফিসারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। এছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর অফিস থেকে তাঁদের জন্মদিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে যায় মোবাইলে। প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী অফিসারদের শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন। এই জমানায় বিডিও’দেরই অনেকে নিজেদের তাই ‘বাংলার দিদির অফিসার’ (বিডিও) বলে থাকেন।
বহু অফিসার একান্তে মানেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনিক আধিকারিকদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেন। প্রশাসক হিসাবে তিনি অনেক সময় কঠোর পদক্ষেপ করেছেন। কিন্তু তিরস্কারের পাশাপাশি ভাল কাজের স্বীকৃতি প্রদানও চালু করেছেন। প্রশাসনিক আধিকারিকদের অনেকেই মনে করেন, সরকারি কল্যাণ প্রকল্প, ভাতা প্রদান, দুয়ারে সরকারের মতো কর্মসূচির সফল রূপায়ণের পিছনে মুখ্যমন্ত্রীর এই একাত্মতা অনুঘটকের কাজ করেছে। সুবিধা প্রদানে দলবাজির অভিযোগ এড়াতেই মুখ্যমন্ত্রী বহু ক্ষেত্রে পঞ্চায়েতকে পাশ কাটিয়ে বিডিও-সহ জেলা স্তরের আধিকারিকদের দিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়িত করিয়েছেন। ডব্লুবিসিএস এক্সিকিউটিভদের সর্ববৃহৎ সংগঠনটির সঙ্গে আগের জমানার মতোই সরকারের সুসম্পর্ক আছে। এখন দেখার অভিযুক্ত বিডিও’দের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ করে। বিডিও’দের নিয়ে অভিযোগ সম্পর্কে ডব্লুবিসিএস এক্সিকিউটিভদের সংগঠন কোনও মন্তব্য করেনি।
নন্দীগ্রামের আক্রান্ত তৃণমূল কর্মীদের দেখতে এসএসকেএমে অভিষেক