দ্য ওয়াল ব্যুরো: সংখ্যাটা কমছিল একটু একটু করে। উধাও হচ্ছিল দুশ্চিন্তা। কিন্তু সদ্য ফুরোনো অর্থবর্ষে প্রসূতি-মৃত্যুর হিসেব হাতে আসার পরে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তিই প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন, 'হু' (WHO)-এর গবেষকদের কাছে। রিপোর্ট বলছে, জটিল প্রসব বা ‘অবস্ট্রাকটেড লেবার’ (Obstructed Labour)-এ প্রসূতি-মৃত্যুর হার এক ধাক্কায় বেড়েছে অনেকটাই। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সদ্যোজাতের মৃত্যুর হারও। পরিসংখ্যান মতো, প্রতি ১১ সেকেন্ডে একজন করে প্রসূতি এবং সদ্যোজাতের মৃত্যু হচ্ছে বিশ্ব জুড়ে।
প্রসূতি ও সদ্যোজাতের মৃত্যু সংক্রান্ত সমীক্ষার রিপোর্ট গত বৃহস্পতিবার সামনে আনে রাষ্ট্রপুঞ্জ। তাতে দেখা গেছে, ২০০০ সাল থেকে প্রসূতিদের মৃত্যু বা প্রসবকালীন শারীরিক সঙ্কটের ঘটনা এক তৃতীয়াংশ কমলেও, ২০১৭ সালের পর থেকে ফের সেটা মাথা চাড়া দিয়েছে। 'হু' জানিয়েছে, প্রতি বছরের হিসেবে বিশ্ব জুড়ে প্রসূতি মৃত্যু ২০ লক্ষেরও বেশি। জটিল প্রসবজনিত কারণে প্রতি দিন অন্তত ৮০০ জন প্রসূতির মৃত্যু হয়। গত বছর প্রতি দিন অন্তত ৭০০০ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। সুতরাং, নবজাতক-মৃত্যুর প্রকৃত হার বা ‘ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট’ (IMR) আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জটিল প্রসব বা Obstructed Labour কী?
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জটিল প্রসবের প্রধান কারণ হল, প্রসবের সময়ে গর্ভস্থ শিশুর মাথা অনেকটা নীচে নেমে আসা। এতে প্রসূতির জড়ায়ু মুখ আটকে যায়। স্বাভাবিক প্রসব অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন ফরসেপ দিয়ে টেনে বা সাকশন পাম্পের মাধ্যমে শিশুকে বার করার চেষ্টা করা হলে শিশু ও মা দু’জনেরই স্বাস্থ্য বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রচুর রক্তপাতও হয়।
এ ক্ষেত্রে অনেক সময় অস্ত্রোপচারও করা হয়। তখন পেটের কাটা অংশ দিয়ে শিশুকে বার করার জন্য চিকিৎসককে শিশুর মাথা ঠেলে উপরের দিকে ওঠাতে হয়, অথবা পা ধরে টেনে শিশুকে বার করতে হয়। এতেও প্রসূতির জরায়ুর নীচের দিকের অনেকটা অংশ কেটে রক্তপাত হয়। ক্ষত বিষিয়ে সেপসিসও হতে পারে। এই সেপসিস প্রসূতি-মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
দেশে প্রসূতি ও নবজাতক মৃ্ত্যুর হার উদ্বেগজনক
‘রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া’ ২০১৩ সালে ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম’ (এসআরএস) বুলেটিন প্রকাশ করেছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল, ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নবজাতক-মৃত্যুর হার একটুও কমেনি, এক জায়গায় থমকে রয়েছে। প্রতি হাজারে একত্রিশ। ওই তিন বছরে ঝাড়খণ্ড, গুজরাত, জম্মু-কাশ্মীর, তামিলনাড়ু প্রসূতি মৃত্যুর হার কমাতে পারলেও, গত দু'বছরে সেটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট’ (IMR) দাঁড়িয়েছে প্রতি হাজারে ৬৮।
স্বস্তির জায়গায় পৌঁছয়নি পশ্চিমবঙ্গও। দেখা গেছে, ২০১৫-’১৬ আর্থিক বছরে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে যত মহিলার (১১৩২)-র মৃত্যু হয়, পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬-’১৭ অর্থবর্ষে তার থেকে ২১৪ জন কম প্রসূতির প্রাণহানি ঘটে। কিন্তু ২০১৭-’১৮ আর্থিক বছরে সেটা আবার প্রায় সাড়ে তিনশো বেড়ে গিয়েছে! সদ্য শেষ হওয়া অর্থবর্ষে রাজ্যে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মোট ১২৭৭ জন প্রসূতি মারা গিয়েছেন। ২০১৬-’১৭ অর্থবর্ষে সংখ্যাটা ছিল ৯১৮। অধিকাংশ প্রসূতিরই মৃত্যুর কারণ হল হাইপারটেনশন, খিঁচুনি এবং প্রসব-পরবর্তী রক্তপাত।