
শেষ আপডেট: 7 June 2023 14:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কথায় বলে 'জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনায়েড'। অন্তত ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় কথাটা বারেবারেই শোনা যায়। এবার উত্তরপ্রদেশের (Uttar Pradesh) ফিরোজাবাদের নিম্ন আদালতের একটি রায়কে নিয়ে আবার উঠে এল এই প্রাচীন প্রবাদ। ৪২ বছর আগে হওয়া একটি গণহত্যার মামলার দশ জন দলিত গ্রামবাসীকে নৃশংসভাবে খুনের দায়ে আদালত মূল অভিযুক্ত গঙ্গা দয়ালকে যাবজ্জীবন কারাবাসের রায় দিয়েছে।
গঙ্গা দয়াল শুধু মূল অপরাধী নয়, এখন 'একমাত্র' অপরাধীও বটে। কারণ বাকি অভিযুক্ত, সাক্ষী সকলেই প্রয়াত হয়েছেন নানা সময়ে। জীবিত গঙ্গা দয়ালের বয়স এখন ৯০ বছর!
ঘটনা ১৯৮১ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মৈনপুরী জেলার সাধুপুর গ্রামে একটি রেশন দোকানকে ঘিরে যাদব ও দলিতদের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। ঠিক কী নিয়ে বিবাদ, সময়ের ভারে সেও ফিকে হয়ে গিয়েছে সাধুপুরের গ্রামবাসীদের মনে। সম্ভবত যাদবদের সেই দোকান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন দলিত সম্প্রদায়ের কয়েকজন। কিন্তু দলিত হয়ে উঁচুজাতের বিরুদ্ধে আপত্তি? এতটাও কি সহ্য করা যায়?
সহ্য করেনি গঙ্গা দয়াল সহ বাকিরা। এই মুহূর্তে গাঁয়ের সবচেয়ে বয়স্কা ব্যক্তি হলেন প্রেমবতী। কত বয়স ঠাহর নেই তাঁর। লোকে বলে, পঁচাত্তর হবে হয়ত! সেই প্রেমবতীর বাড়িতেই হামলা চালায় আক্রমণকারীরা। 'সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টা নাগাদ ওরা আমাদের বাড়িতে ঢুকে আসে। কোনও কথা না বলে গুলি চালাতে থাকে। কিছু চায়নি, জিজ্ঞেস করেনি। স্রেফ গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিল চারদিক', বিবিসিকে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন প্রেমবতী।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর দশ, আট আর চোদ্দ বছরের তিন ছেলেমেয়ের নিথর দেহ ছিটকে পড়ে এদিকে ওদিকে। মোট দশ জন দলিত গ্রামবাসী প্রাণ হারান। গুলি এসে লাগে প্রেমবতীর পায়েও। সেই দাগ এখনও আছে।
কিন্তু বিচার পেতে পেতে চার দশক গড়িয়ে গেল কেন?
সরকারি কৌঁসুলি রাজীব উপাধ্যায় বলেন, সমস্যাটা হয়েছে নিয়মকানুনের। যখন খুনগুলো হয়, তখন এটা ছিল মৈনপুরী জেলা। ১৯৮৯ সালে জেলা ভাগাভাগি হয়ে এই অঞ্চলটা এসে পড়ে ফিরোজাবাদ জেলায়। কিন্তু ২০০১ সাল অবধি মামলার সমস্ত নথিপত্র মৈনপুরীতেই পড়ে ছিল। এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশ আসার পরে সেসব ফিরোজাবাদ জেলা আদালতে সরানো হয়। শুনানি শুরু হতে হতে পেরিয়ে যায় আরও দুই দশক। ২০২১ সাল নাগাদ জমে থাকা মামলা শেষ করতে ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি হতেই এই মামলাটি বেরিয়ে আসে। শুরু হয় জরুরি ভিত্তিতে শুনানি।
শুরুতে অবশ্য এমনটা ছিল না। গ্রামবাসীরা জানাচ্ছেন, ঘটনাটি রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছিল খবরে। গ্রামে এসেছিলেন তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তৎকালীন বিরোধী নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী। সকলেই ঢালাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সুবিচার মিলবে। বাজপেয়ী ও বিশ্বনাথপ্রতাপ দু'জনেই পরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু বিচার কিছুই মেলেনি।
দীর্ঘ সময় গড়িয়েছে। অপরাধে যুক্ত দশ জন অভিযুক্তই ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে। চলে গিয়েছেন সাক্ষীরাও। জীবিত গঙ্গা দয়ালকেই শেষে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা শোনাল আদালত। সঙ্গে ৫৫,০০০ টাকার জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১৩ মাসের হাজতবাস।
কিন্তু ৯০ বছর বয়সে এসে আর যাবজ্জীবন সাজার মানে বলে কিছু থাকে কি? জানেন না প্রেমবতী। গ্রামবাসীরাও জানতেন না কিছুই। রায়ের খবর বেরনোর পরে সংবাদমাধ্যমের আনাগোনা বেড়েছে গ্রামে। সাংবাদিকদের কাছেই তাঁরা জানতে পেরেছেন সাজার কথা। প্রেমবতী হাত উল্টে বলেন, 'এটা বিচার হল কিনা তা বোধ হয় ঈশ্বরই বলতে পারবেন!'
ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করতে হবে ১৫ জুনের মধ্যে, নির্বাচনের দিন জানালেন অনুরাগ