বনকর্মীরা রাতভর চেষ্টার পর একটিকে ফের জঙ্গলে পাঠাতে সক্ষম হলেও, অন্যটি চলে আসে পশ্চিম কাঁঠালবাড়ি গ্রাম পেরিয়ে মেজবিল নিউরোড পর্যন্ত। মাঝরাতে বুড়ি তোর্ষা সেতুর কাছে সেটিকে প্রথম দেখতে পান জাতীয় সড়ক দফতরের কর্মীরা। সেখান থেকে পরে প্রাণীটি গিয়ে আশ্রয় নেয় এক বাঁশবাগানে।

শেষ আপডেট: 6 October 2025 13:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরবঙ্গের জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান যেন এখন প্রকৃতির প্রলয়ের মুখে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। প্রবল বৃষ্টিতে ফুলে ফেঁপে উঠেছে তোর্ষা, বুড়ি তোর্ষা, মালঙ্গি ও হলং নদী। এই ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসেই রবিবার ভেসে যায় উদ্যানের একাধিক গণ্ডার। তাদের মধ্যে দুটি জঙ্গলের বাইরে গ্রাম এলাকায় ঢুকে পড়ে। বনকর্মীরা রাতভর চেষ্টার পর একটিকে ফের জঙ্গলে পাঠাতে সক্ষম হলেও, অন্যটি চলে আসে পশ্চিম কাঁঠালবাড়ি গ্রাম পেরিয়ে মেজবিল নিউরোড পর্যন্ত। মাঝরাতে বুড়ি তোর্ষা সেতুর কাছে সেটিকে প্রথম দেখতে পান জাতীয় সড়ক দফতরের কর্মীরা। সেখান থেকে পরে প্রাণীটি গিয়ে আশ্রয় নেয় এক বাঁশবাগানে।
রাত থেকে সকাল পর্যন্ত বন দফতরের কর্মীরা নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছেন গণ্ডারটিকে উদ্ধারের জন্য। কিন্তু সমস্যা তৈরি করছে কৌতূহলী মানুষের ভিড়। শত শত মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন গণ্ডার দেখতে, আর তাতেই বিপাকে পড়ছেন বনকর্মীরা। বন দপ্তরের তরফে জানানো হয়েছে—মানুষের ভিড় না কমলে উদ্ধার অভিযান আরও জটিল হয়ে উঠবে।
দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গ। নদীর উথাল জলে ডুবে গেছে বনাঞ্চলের রাস্তা, ভেসে গেছে কয়েকটি সেতু। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৮ জনের—এর মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক এবং জলদাপাড়ার কয়েকটি বন্যপ্রাণীও। হলং নদীর কাঠের সেতুটি ভেসে যাওয়ায় জলদাপাড়ার মূল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জলদাপাড়া টুরিস্ট লজেও আটকে পড়েছিলেন প্রায় ২৫ জন পর্যটক, যাদের পরে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় উদ্ধার করা হয়। বন দফতর জানিয়েছে, পর্যটক ও কর্মীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আপাতত সব ধরনের পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। রাস্তা, সেতু ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা শেষে পুনরায় খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলার সবচেয়ে বেশি একশৃঙ্গ গণ্ডার জলদাপাড়াতেই পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, এখানকার গণ্ডারের সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫টির মধ্যে। গণ্ডার ছাড়াও এই অরণ্যে রয়েছে হাতি, বন্য মহিষ, গৌর, চিতল হরিণ ও অসংখ্য পরিযায়ী পাখি। এবারের অতি বৃষ্টিতে বেশ কয়েকটি প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তোর্ষা, দিনাই, মালঙ্গি ও হলং নদীর তীর ঘেঁষে বিস্তৃত জলদাপাড়ার ঘন জঙ্গল, শাল-সেগুনবন ও ঘাসভূমি এখন জলমগ্ন। গণ্ডার ও হরিণের মতো ঘাসভূমিনির্ভর প্রাণীরা বাধ্য হয়ে আশ্রয় খুঁজছে গ্রামাঞ্চলে।
দুর্গাপুজোর সময় জলদাপাড়া পর্যটনের অন্যতম ব্যস্ততম কেন্দ্র। প্রতি অক্টোবরেই ৭ থেকে ৯ হাজার পর্যটক আসেন দেশ-বিদেশ থেকে। গণ্ডার দেখা, হাতির পিঠে সাফারি, জিপ সাফারি—সব মিলিয়ে এই সময়টাতেই সর্বাধিক রাজস্ব আয় হয় বন দপ্তরের। কিন্তু এবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই মৌসুমেই বড় ধাক্কা খেল স্থানীয় পর্যটন ব্যবসা ও হোমস্টে শিল্প।
বন দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলেই রাস্তা ও সেতু মেরামতের কাজ শুরু হবে। তারপর ধাপে ধাপে পর্যটন চালু করা হবে। বনকর্মীদের আশা, খুব শিগগিরই জলদাপাড়া আবার ফিরে পাবে তার চেনা ছন্দ।