
শেষ আপডেট: 1 February 2023 11:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন (Nirmala Sitharaman) বুধবার বাজেট প্রস্তাবে আয়করের (income tax) যে নতুন স্কিম ঘোষণা করেছেন তাতে মধ্য আয়ের লোকেদের কর বাবদ অনেক টাকা সাশ্রয় হবে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু নতুন স্কিমে সাধারণ নাগরিকের (citizens) সঞ্চয়ে ভাটা পড়বে বলে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মনে করছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকার আসলে মানুষকে আরও খরচে উৎসাহ জোগাতে এই সুবিধা ঘোষণা করেছে। তাতে বাজারে লেনদেন বাড়বে। জিএসটি বাবদ সরকারের আয় বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ব্যক্তিগত সঞ্চয় মার খাবে।
আয়কর বিশেষজ্ঞরা কেন এই কথা বলছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে কয়েকটি জরুরি কথা বলে নেওয়া যাক। নির্মলা সীতারমন বুধবার যে আয়কর কাঠামো ঘোষণা করেছেন সেটি আসলে ২০২১-এ ঘোষিত কর কাঠামোর সংশোধন। তার আগে থেকে চালু হওয়া পুরনো কর কাঠামো কিন্তু বাতিল করা হয়নি। যদিও ধীরে ধীরে সেই কাঠামো বাতিল করা হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
২০২১-এ ঘোষিত কর কাঠামো, যেটিকে এখনও নতুন কর ব্যবস্থা বলা হয়ে থাকে, তাতে আয়কর আইনের ৮০-সি এবং ৮০-ডি ধারা বলে সঞ্চয় থেকে আয়ের উপর কর ছাড়ের সুযোগ আগেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ প্রভিডেন্ট ফান্ড, পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা অর্থ, এলআইসির প্রিমিয়াম, ডাকঘর সঞ্চয় প্রকল্পে আমানত, বাড়িভাড়া, গৃহঋণের উপর কর ছাড় পাওয়া যেত না। বুধবার অর্থমন্ত্রী যে ঘোষণা করেছেন তাতে কর কাঠামো বা ট্যাক্স স্ল্যাবের বদল আনা হয়েছে। বাধ্যতামূলক সঞ্চয় থেকে আয়করের সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা কিন্তু ফিরছে না।
এই নয়া কাঠামোয় কর বাবদ তুলনামূলকভাবে কম টাকা আয়কর বাবদ সরকারকে দিতে হবে। যেমন দৃষ্টান্ত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বার্ষিক আয় নয় লাখ টাকার মধ্যে থাকলে আয়কর দিতে হবে ৪৫ হাজার টাকা। আগের কর কাঠামোর তুলনায় অনেকটা কম। এরফলে কর রাজস্ব বাবদ সরকারের বছরে ৩৮ হাজার কোটি টাকা কম আয় হবে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, আপাত দৃষ্টিতে ভোটের অঙ্কে সরকার মধ্যবিত্তদের খুশি করার চেষ্টা করেছে নয়া কর কাঠামো ঘোষণা করে। কিন্তু কর ছাড়ের ক্ষতি সরকার জিএসটি থেকে পুষিয়ে নেবে। ফলে ঘুরিয়ে করের কাঁটা থাকছেই।
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, কম কর দেওয়ার সুবিধা নিতে আগ্রহ এবার বাড়বে। ২০২১-এ ঘোষিত আয়কর কাঠামোয় মানুষ ততটা আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু বিপদের দিকটি হল, কর বাবদ কম খরচের ফলে অর্থের কী হবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ মানুষই কর ছাড়ের সুবিধাজনিত অর্থ কেনাকাটায় খরচ করবেন, এমন সম্ভাবনাই বেশি। এরফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা হবে। কেনাকাটা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। সামগ্রিক অর্থনীতি মজবুত হবে।
কিন্তু বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ে আগ্রহ কমে যাবে। তাতে ব্যক্তি নাগরিকের ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিয়তার মধ্যে পড়তে পারে, তেমনই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত কমে যাবে। একই সঙ্গে রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘের মতো অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যারা আয়কর ছাড়ের সুবিধার কারণে দান বাবদ অর্থ পেয়ে থাকে তাদের রোজগার কমে যেতে পারে। বেদ অ্যান্ড জৈন অ্যাসোসিয়েটসের কর বিশেষজ্ঞ অঙ্কিত জৈনের কথায়, অর্থমন্ত্রীর বুধবারের ঘোষণার সঞ্চয় মার খাবে। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলির আয় কমবে।
যদিও আর একদল আর্থিক বিশেষজ্ঞর মতে, সরকার কেনাকাটায় উৎসাহ জুগিয়ে আর্থিক লেনদেনে জোয়ার আনতে চাইছে। তার সুবাদে সমাজের বিপুল অংশের মানুষের রোজগার বৃদ্ধি পাবে। উদ্বৃত্ত অর্থ সঞ্চয় করার প্রবণতা তাতে বাড়বে। তাদের বক্তব্য, সঞ্চয় কমলেও বাজারে বিনিয়োগ বাড়বে। আয়কর দাতাদের একটি বড় অংশ চল্লিশ বছরের কম বয়সি। তারা ডাকঘর বা ব্যাঙ্কের নিশ্চিত কিন্তু সীমিত সুদের স্কিমে টাকা না রেখে মিউচ্যুয়াল ফান্ড, শেয়ারে টাকা রাখে। এটা বিনিয়োগ বা ইনভেস্টমেন্ট হলেও এক ধরনের সঞ্চয়। কারণ, উদ্দেশ্য হল মাথা খাটিয়ে নিজের টাকা বাড়িয়ে নেওয়া। নয়া কর কাঠামো সেই প্রবণতাকে আরও উৎসাহ দেবে। বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ পল্লভ পি নারাগ এই কারণে আয়করের নয়া ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন।