দ্য ওয়াল ব্যুরো: এখনও ওই মানুষগুলোর মুখ দেখতে হয় তাঁকে। অবশ্য ওদের আর মানুষ বলে ভাবতে পারেন না তিনি। ভাবেন কোনও ঘৃণ্য জন্তু। আর যত বার সেই মানুষরূপী জন্তুগুলোকে দেখেন, ততবার মনে পড়ে যায় একমাত্র মেয়েটার সেই চরম কষ্ট পেয়ে মারা যাওয়ার কথা। অসহনীয় যন্ত্রণার দিন ক’টা ফিরে আসে স্মৃতিতে। আর প্রতিবারই যেন এক বার করে মৃত্যু হয় তাঁর নিজের। সাত বছরের লড়াইয়ে বারবার এই মৃত্যুযন্ত্রণার সম্মুখীন হচ্ছেন তিনি রোজ। তিনি নির্ভয়ার মা। আশাদেবী।
তবে নির্ভয়াকে যে এই অবিচারের পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হল না, তাঁকে যে ধর্ষকদের মুখোমুখী হতে হল না আর, সেটাই যেন সান্ত্বনা কাতর মায়ের।
আজ ১৬ ডিসেম্বর। সাত বছর আগে, ২০১২ সালে এই দিনেই দেশের রাজধানীর বুকে ঘটে গিয়েছিল নৃশংসতম এক ধর্ষণ। বন্ধুর সঙ্গে ‘লাইফ অফ পাই’ সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন প্যারামেডিক্যালের ছাত্রী, ২৩ বছরের নির্ভয়া। রাতে বাড়ি ফেরার জন্য একটি বাসে ওঠেন তাঁরা। আর তার ঘণ্টা খানেকের মধ্যে বাসের ভিতরেই চার যুবকের বিকৃত লালসার শিকার হন নির্ভয়া। তাঁর বন্ধুকে বেধড়ক মারধর করে বেঁধে রাখা হয়। তাঁর সামনেই গণধর্ষণ করা হয় নির্ভয়াকে। তাঁর যোনিতে রড ঢুকিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয় নির্মম ভাবে। তার পরে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয় তাঁদের।
হাড়হিম করা এই ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসতেই কেঁপে গেছিল সারা দেশ। পথে নেমেছিল সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদে, বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল রাজপথ। কিন্তু সেই প্রতিবাদই সার। অপরাধীদের গ্রেফতার করা হলেও, এত বছর পরেও কোনও শাস্তি হয়নি তাদের। আজ, সোমবার, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া চরম ঘটনাটির দিনে সে কথাই আরও এক বার মনে করিয়ে দিলেন আশা দেবী। সরকার ও বিচার বিভাগের কাছে ধর্ষকদের দ্রুত ফাঁসি ঝোলানোর আবেদন জানালেন আরও এক বার।
আজ দিল্লিতে নারীসুরক্ষা বিষয়ক একটি আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, “দীর্ঘ সাত বছর ধরে ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিচ্ছি আমি। কিন্তু, প্রশ্ন করতে করতে, ন্যায়বিচার চাইতে চাইতে আমিও ক্লান্ত।”
এই সাত বছর তিনি ও তাঁর পরিবার কী অবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে তা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “আদালতে গিয়ে যখন ধর্ষকদের দেখি, তখন আমার মেয়ে বেঁচে নেই বলে শান্তিই পাই একটু। ওর খুনিদের দেখে তো প্রতিদিন মৃত্যু হয় আমার। আমার মেয়ে তো কোনও ভুল করেনি। আমরা বিচারের জন্য অপেক্ষা করে কি তাহলে ভুল করছি? কেন সরকার বা সমাজ এখনও এর সমাধান বের করতে পারেনি?”
চোখের জলে, মোমের আলোয় পেরিয়ে যায় আরও একটা ১৬ ডিসেম্বর। ব্যস, ওইটুকুই। অপেক্ষার পালা আর ফুরোয় না ক্লান্ত মায়ের। এক দিকে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা আর অন্য দিকে বিচার ব্যবস্থার গাফিলতি-- এই দুইয়ের মাঝে বয়ে যায় চোখের জল।