নদিয়ার কল্যাণী এইমসে (Kalyani AIIMS) ভাইরাস রিসার্চ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে দু’জন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের সন্দেহ ধরা পড়েছে।
.jpeg.webp)
কল্যাণী এইমসে ভাইরাস রিসার্চ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে দু’জন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের সন্দেহ ধরা পড়েছে।
শেষ আপডেট: 13 January 2026 14:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়েছে নিপা ভাইরাস (Nipah Virus West Bengal)। সোমবার নদিয়ার কল্যাণী এইমসে (Kalyani AIIMS) ভাইরাস রিসার্চ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে দু’জন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের সন্দেহ ধরা পড়েছে। দু’জনেই বর্তমানে চিকিৎসাধীন এবং তাঁদের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক বলে জানিয়েছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর।
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, নিপা একটি জুনোটিক রোগ (nipah virus zoonotic) —অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়—এবং এর মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি। তাই গোটা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। আক্রান্ত দু’জন সম্প্রতি ব্যক্তিগত কাজে পূর্ব বর্ধমানে গিয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরেই উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান এবং নদিয়া—এই তিন জেলায় জোরদার কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং শুরু হয়েছে।
হেল্পলাইন চালু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্য রাজ্য সরকার তিনটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে—03323330180 / 9874708858 / 9836046212 (Nipah Virus Helpline)। পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাজ্য সরকারকে সহায়তা করতে জাতীয় স্তরের যৌথ আউটব্রেক রেসপন্স টিমও মোতায়েন করা হয়েছে।
নিপা ভাইরাস কী? (Nipah Virus)
নিপা ভাইরাসের নামকরণ হয়েছে মালয়েশিয়ার কাম্পুং সুংগাই নিপা গ্রাম থেকে, যেখানে ১৯৯৮–৯৯ সালে প্রথম বার এই ভাইরাসের খোঁজ মেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, নিপা ভাইরাস একটি জুনোটিক সংক্রমণ, যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এই ভাইরাস হেনিপাভাইরাস (Henipavirus) গোত্রভুক্ত। এর প্রধান প্রাকৃতিক বাহক হল ফলখেকো বাদুড় (Nipah Virus Fruit Bat) বিশেষ করে Pteropodidae পরিবারভুক্ত বাদুড়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে শূকরও মধ্যবর্তী বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।
নিপা ভাইরাসের উপসর্গ কী কী? (Nipah Virus Symptomps)
নিপা ভাইরাসের উপসর্গ অনেক সময় সাধারণ ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো হওয়ায় শুরুতে ধরা পড়া কঠিন হয়। সাধারণ উপসর্গগুলি হল—
জ্বর
শরীর ব্যথা ও পেশিতে যন্ত্রণা
গলা ব্যথা
শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নিতে অসুবিধা
তবে সংক্রমণ গুরুতর হলে আরও ভয়ঙ্কর উপসর্গ দেখা দিতে পারে—
শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক সমস্যা
খিঁচুনি
বিভ্রান্তি ও অচেতনতা
মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কোনও কোনও ক্ষেত্রে উপসর্গ না-ও দেখা দিতে পারে। কিন্তু সেই ব্যক্তি সংক্রমণের বাহক হয়ে অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন—এটাই নিপার সবচেয়ে বড় বিপদ।
কীভাবে নিপা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়? (Nipah Virus detection)
নিপা ভাইরাসকে বায়োসেফটি লেভেল-৪ (BSL-4) শ্রেণির ভাইরাস হিসেবে ধরা হয়। ফলে শুধুমাত্র বিশেষ সুরক্ষিত ল্যাবরেটরিতেই এর পরীক্ষা করা যায়।
নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত পরীক্ষাগুলি হল—
রক্ত পরীক্ষা করে অ্যান্টিবডি শনাক্তকরণ
টিস্যুর মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষা (হিস্টোপ্যাথলজি)
PCR / RT-PCR পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাল উপাদান শনাক্তকরণ
ELISA ও Serum Neutralization Test
নিপার চিকিৎসা কি আছে? (Nipah Virus treatment)
বর্তমানে মানুষের বা পশুর জন্য নিপা ভাইরাসের কোনও টিকা নেই। তাই চিকিৎসার মূল ভরসা হল ইনটেনসিভ সাপোর্টিভ কেয়ার। আক্রান্তদের সম্পূর্ণ আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা করা হয়।
কেরালার অভিজ্ঞতা থেকে জানা গিয়েছে—২০১৮ সালে প্রথম নিপা সংক্রমণে কেরালায় মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৯১ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলিতে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ (যেমন রেমডেসিভির) ব্যবহারের ফলে মৃত্যুহার অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়েছে। ২০২৩ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৩৩ শতাংশে। ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক কেরালা সংক্রমণেও দ্রুত অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিভাইরাল প্রয়োগ করা হয়।
সাধারণ মানুষের জন্য কী বার্তা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাদুড়ের সঙ্গে নিরাপদ সহাবস্থান শিখতেই হবে। কাঁচা খেজুরের রস, আধখাওয়া ফল বা বাদুড়ের সংস্পর্শে আসতে পারে—এমন খাবার এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। নিপা ভাইরাস বিরল হলেও অত্যন্ত মারাত্মক। তাই সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসাই পারে এই মারণ ভাইরাসের মোকাবিলা করতে।