
শেষ আপডেট: 4 October 2018 11:53
রূপাঞ্জন গোস্বামী: কয়েকদিন আগেই ফেসবুক জানিয়েছিল, প্রায় ৫ কোটি ফেসবুক ইউজারের অ্যাকাউন্ট হ্যাকাররা নিয়ন্ত্রণ করছে। সম্প্রতি জানা গেছে আরও এক ভয়ংকর তথ্য। এরকম কিছু হ্যাক করা অ্যাকাউন্ট ডার্ক ওয়েবে বিক্রি হচ্ছে তিন ডলারে বা মাত্র ২১৯ টাকায়।
এবার জেনে নিন সর্বনেশে ডার্ক ওয়েব কী ? আমরা ইন্টারনেটের যে স্তরে ফেসবুক, টু্ইটার, গুগল, হোয়াটস্অ্যাপ, নেট ব্যাঙ্কিং, অনলাইন শপিং বা অন্যান্য অনেক কিছু আপলোড এবং ডাউনলোড করে থাকি, তাকে বলা হয় সারফেস ওয়েব। এখানে যেকোনও ইন্টারনেট ইউজার প্রবেশ করতে পারেন। এই স্তরের নিচে আছে ডিপ ওয়েব। ইন্টারনেটের এই স্তরে সাধারণ ইন্টারনেট ইউজাররা প্রবেশ করতে পারবেন না। এই স্তরের ওয়েবে সাধারণত বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন সুরক্ষা সংস্থা, বিভিন্ন লাইব্রেরি, মিউজিয়াম তাঁদের গোপনীয় তথ্যগুলি রাখে। ইন্টারনেট স্তরগুলির সবচেয়ে নীচে অবস্থান করে ডার্ক ওয়েব । এখানে প্রবেশের পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। সোজা কথায় এটা ইন্টারনেটের অন্ধকার জগৎ, হ্যাঁ আন্ডারওয়ার্ল্ড। আপনি এখানে কাউকে খুন করার জন্য সুপারি কিলার ভাড়া করতে পারেন। যেকোনও আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে পারেন। রিভলভার থেকে অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান পর্যন্ত। মারিজুয়ানা, এলএসডি, সাইক্লোন, ইয়াবা অনায়াসে কিনতে পারেন। কিনতে পারেন যৌনদাসী। পয়সার বিনিময়ে ঢুকতে পারেন চাইল্ড পর্ন সাইটে। বিল মেটাতে হবে ভার্চুয়াল কারেন্সি বিটকয়েন দিয়ে। অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এই ইন্টারনেট জগতে আনাগোনা বিশ্বের প্রায় সব দাগী মাফিয়া ও হ্যাকার ও স্মাগলারদের। এই ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে কে কোথায় কী বিক্রি করছে, কে কিনছে, কত দামে কিনছে , তা বের করা ভূতের বাপের পক্ষেও অসম্ভব। আর সেই ডার্ক ওয়েবে বিক্রি হচ্ছে হ্যাক করা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, মাত্র ২১৯ টাকায়।
বিখ্যাত পত্রিকা ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছে ডার্ক ওয়েবের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট 'ড্রিম মার্কেট' রীতিমতো রেটিং দিয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বিক্রি করছে। যেমন আমাজন, ফ্লিপকার্ট, সারফেস ওয়েব-এ তাদের বিভিন্ন পণ্যের ওপর রেটিং দেয়। এই হ্যাক করা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট গুলো ৩ থেকে ৮ ডলারে (২১৯,৯৫ থেকে ৮৮০,০২ টাকা) বিক্রি করা হয় ক্রেতাদের। কেন অন্যের অ্যাকাউন্ট ক্রেতারা কিনবেন ? এই সব অ্যাকাউন্ট দিয়ে নাশকতামূলক কাজ করা যেতে পারে। দায় পড়বে আসল ইউজারের ঘাড়ে। বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব , সেলিব্রেটি, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর অ্যাকাউন্ট কিনে সেখানে অশ্লীল বা অনৈতিক পোস্ট করে তাঁদের কেরিয়ারের বারোটা বাজানো যেতে পারে। বিভিন্ন কোম্পানি ইউজারের তথ্য কিনতে পারে প্রডাক্ট হিসেবে। যা সেই কোম্পানি অন্য কোনও কোম্পানি বা রাজনৈতিক দলকে বেচতে পারে। আপনার ফোনে বা ইমেলের নিয়মিত বিভিন্ন কোম্পানির প্রমোশনের তথ্য আসে। জানতে চেষ্টা করেছেন আপনার এই তথ্য তারা পায় কী ভাবে? তবে পাঠক, আপনাকে সতর্ক করে দিয়ে বলি, কোনও ভাবেই আপনি ডার্ক ওয়েবে ঢোকার চেষ্টা করবেন না। চরম বিপদে পড়বেন।
[caption id="attachment_40126" align="aligncenter" width="508"]
ডার্ক ওয়েবে খোলাখুলি আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয় ওয়েবসাইট গুলি[/caption]
গত সপ্তাহে ফেসবুক ঘোষণা করেছিল যে প্রায় ৫ কোটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকারদের হাতে। যদিও ফেসবুক বলেছে, হ্যাকাররা ফেসবুকের সঙ্গে লিঙ্ক করা থার্ডপার্টি অ্যাপ্লিকেশন যেমন টুইটার, ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট গুলি হ্যাক করতে পারেনি। ফেসবুক আইডি দিয়ে লগ ইন করে যদি কেউ অন্য কোনও অ্যাপ্লিকেশনে ঢুকেও থাকেন, সেগুলি সুরক্ষিতই আছে বলে জানিয়েছেন ফেসবুকের প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট গাই রজেন। .
ফেসবুক প্রধান মার্ক জুকেরবার্গ জানিয়েছেন হ্যাকিংয়ের বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে ২৫ সেপ্টেম্বর। তার আগে বিশ্বজুড়ে ফেসবুকের 'view as' অপশনটিতে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক সক্রিয়তা নজরে পড়ে ফেসবুকের। এর পরেই ফেসবুক 'view as' ফিচারটি নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এরপর ফেসবুক প্রায় ৫ কোটি হ্যাকড অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার করে। আসল ফেসবুক ইউজারকে নতুন পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকতে সাহায্য করে। ফেসবুক জানিয়েছে হ্যাকাররা শুধুমাত্র ফেসবুক ইউজারদের ব্যক্তিগত তথ্য জানতেই আগ্রহী ছিল। যেমন নাম, লিঙ্গ, ঠিকানা ইত্যাদি। কিন্তু কেন তার কারণ ফেসবুক খুঁজে পায়নি। হ্যাকাররা ইউজারদের পোস্ট বা মেসেজে কিছু কারিকুরি করেছে কিনা জানতে ফেসবুক উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে। তাই ফেসবুক আসল ইউজাররা নতুন করে অ্যাকাউন্টে ঢুকলে, সদ্য করা কিছু পোস্ট ও সদ্য অ্যাড করা কিছু বন্ধুকে ফেসবুক দেখাচ্ছে। যদি ইউজার মনে করেন তিনি এগুলি করেননি, তিনি সেগুলি মুছে ফেলার সুযোগ পাবেন। ফেসবুক জানিয়েছে তারা আরও ৪ কোটি অ্যাকাউন্টকে বিপদমুক্ত করার কাজে লেগেছেন যে গুলির 'view as' বোতামটি টেপা হয়েছিল।
[caption id="attachment_40127" align="aligncenter" width="527"]
ডার্ক ওয়েবে ইচ্ছেমতো হরেক কিসিমের মাদক কেনা যায়[/caption]
সব না হয় মানা গেল। কিন্তু ডার্ক ওয়েবে, ফেসবুক অ্যাকাউন্টের দোকান খুলে রাখা ওয়েবসাইট গুলোর টিকি কি ছুঁতে পারবে ফেসবুক? যে ডার্ক ওয়েবে সিআইএ, কেজিবি, মোসাদ, এম-১৫ এর দুঁদে গোয়েন্দারা নাজেহাল হন দাগীদের খুঁজে পেতে। যেখানে সারা পৃথিবীকে অন্ধকারে রেখে লক্ষ কোটি ডলারের কেনাবেচা হয় বিটকয়েন দিয়ে। সেখানে ফেসবুক অ্যাকাউন্টের বিক্রি হওয়া ফেসবুক আটকাবে কী করে তা বোঝা যাচ্ছে না। যে ফেসবুক সারফেস ওয়েবেই হ্যাকারদের জ্বালায় নাস্তানাবুদ, ডার্ক ওয়েবের বাস্তুঘুঘুদের সঙ্গে ফেসবুকের টেকনোলজির লড়াই বা বড়াই যে ধোপে টিকবে না তা বলাই যায়। তাই ফেসবুক করুন 'ভগবান ভরসা' জপতে জপতে।