দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাসে পাঁচ হাজার টাকা বেতনের চাকরি দেওয়া হবে। এমনই প্রতিশ্রুতি দিয়ে শ্রমিক পরিবারের সদ্যতরুণী সাঁওতালি মেয়েটিকে ঝাড়খণ্ড থেকে দিল্লি নিয়ে গিয়েছিল এক ব্যক্তি। চার মাস পরে তিনি ঘরে ফিরলেন সারা শরীরে কালশিটে নিয়ে, ক্ষতবিক্ষত যোনি নিয়ে।
গত মাসের ২৭ তারিখ বাড়ি ফেরেন তিনি। তার পরে তিনি জানিয়েছেন, দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। অকথ্য নির্যাতনের পরে পালিয়ে এসে, ৮০০ কিলোমিটার পথ পায়ে হাঁটার পরে, কোনওক্রমে নিজের গ্রামে ফিরতে পেরেছেন তিনি। নৃশংস অত্যাচার ও ধর্ষণের পরে তাঁর বেঁচে ফেরার কাহিনি যেন হার মানায় রুপোলি পর্দার থ্রিলারকেও!
তরুণী জানিয়েছেন, সৃজন মুর্মু নামে তার গ্রামেরই এক বাসিন্দার সঙ্গে দিল্লি পৌঁছন তিনি। কথা ছিল, মিশনারি সোসাইটিতে চাকরি করবেন। কিন্তু পৌঁছনোর পরেই সৃজন মুর্মু তাঁকে পুরনো দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয় অচেনা একটি লোকের কাছে।
“আমি কিছু বুঝতেই পারিনি। কথা বলারও সুযোগ পাইনি। আমায় ওই লোকটার বাড়িতে সারাদিন ঘরের কাজ করতে হতো। রাতে আমায় ধর্ষণ করত বারবার। আমি চিৎকার করলেই গলার সামনে ছুরি ধরত।”—আতঙ্ক এখনও ফুটে ওঠে তরুণীর গলায়।
এভাবেই চলে কয়েক মাস, তার পরেই পালানোর সুযোগ আসে তরুণীর। তাঁর কথায়, “এক দিন রাতের বেলা চার-চারটে ষণ্ডা লোক ঢুকে আসে আমার ঘরে। ওরা মদ খেয়ে ছিল। আমি ভয়ে সিঁটিয়ে যাই। চিৎকার করতে পারছিলাম না। পিছোতে পিছোতে খোলা জানলার কাছে পৌঁছে যাই আমি। ওরা হাসছিল। আমি ঝাঁপ দিই খোলা জানলা থেকে। এর আগেও ওই জানলা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলাম আমি। কিন্তু পারিনি। সেদিন উপায় ছিল না। ভেবেছিলাম তিনতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরেই যাব, কিন্তু জানি না কীভাবে বেঁচে গেলাম।”
পড়ার পরেই বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল, তেমন কোনও আঘাত লাগেনি তার। তার পরেই ছুটতে শুরু করেন তিনি। রাতের অন্ধকারে, অচেনা পথে অনেকটা ছুটে পালান প্রাণের দায়ে। সকাল হয় অচেনা কোনও এক শহরে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকা সেই তরুণী বাধ্য হন ভিক্ষাবৃত্তি করতে। ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে খেতেও বাধ্য হয় বলে জানান তিনি।
“সবাই ভাবত আমি পাগল, পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কেউ কিছু বলত না আমায়। খাবারদাবারও জুটে যেত ঠিক।”—বলেন তরুণী।
সে জানায়, এর পরে হাঁটতে শুরু করে সে। কিন্তু কোন দিকে হাঁটছে, কত দূর যেতে হবে, কোনও ধারণা ছিল না। তার উপর সাঁওতালি ছাড়া অন্য কোনও ভাষাও জানে না সে। ফলে কারও কাছে কিছু জানাও সম্ভব নয়। “যা পেতাম তাই খেতাম। স্নান হয়নি কতদিন। রাতে ভয় করত। গাছের উপর চড়ে থাকতাম। দিনে কোনও সময় হয়তো কোথাও ঘুমে ঢুলে পড়তাম। ভয়... সারাক্ষণ ভয় তাড়া করে বেড়াত। শুধু হাঁটতাম যতটা পারতাম। কত দিন হেঁটেছি, মনে নেই।”—বলেন আতঙ্কিত, বিধ্বস্ত তরুণী।
কতদিন ধরে কতটা হেঁটে কোথায় পৌঁছেছিলেন, কোনও হিসেব ছিল না তাঁর। একদিন পথেই অচৈতন্য হয়ে পড়ে যান তিনি। মধ্যপ্রদেশের সিদ্ধি জেলার একটি লোকালয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার করেন অচেতন তরুণীকে। দিল্লি থেকে সে জায়গার দূরত্ব ৮০০ কিলোমিটার!
ওই স্থানীয় বাসিন্দারাই পুলিশের কাছে নিয়ে যান তরুণীকে। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। তরুণীকে যাই জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি উত্তর দেন সাঁওতালি ভাষায়। অন্য কোনও ভাষা না পারেন বুঝতে, না পারেন বলতে। শেষমেশ ওই এলাকারই অঙ্কিত রাজগড়িয়া এক যুবককে ডেকে আনেন পুলিশকর্তারা। ধানবাদের সেই যুবক সাঁওতালি বুঝতে পারেন।
তার পরেই জানা যায় ওই তরুণীর পরিচয়-ঠিকানা। তাঁর সঙ্গে যা যা হয়েছে, সে সবও খুলে বলেন তিনি। এর পরেই ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ থানায় যোগাযোগ করে মধ্যপ্রদেশ পুলিশ। যোগাযোগ হয় তরুণীর পরিবারের সঙ্গেও। শেষমেশ বাড়ি ফিরতে পারেন তিনি।
সৃজন মুর্মু নামের ওই যুবকের বিরুদ্ধে নারীপাচারের মামলা রুজু করে ঝাড়খণ্ড পুলিশ।
এই তরুণীর ভয়াবহ ঘটনা সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট হয়েছে, তিনি একা নন। ঝাড়খণ্ডের ওই এলাকার বহু মেয়েকেই এভাবে মিথ্যে বলে গ্রাম থেকে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। কোনও খোঁজ মেলেনি তাদের। ওই তরুণীর প্রতিবেশী এক পরিবারের অভিযোগ, তাদের বাড়িরও দু’টি মেয়ের কোনও খোঁজ নেই গত তিন বছর ধরে। ওই সৃজন মুর্মুই তাদের চাকরি দেওয়ার নাম করে নিয়ে গেছে।
সাহেবগঞ্জের পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট আমন কুমাপও জানিয়েছেন, এই এলাকা থেকে মেয়েদের নিখোঁজ হওয়াটা যেন নিয়মে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। পাহাড়িয়া, সাঁওতালি এই সব সম্প্রদায়ের মেয়েদের মধ্যেই এমনটা বেশি ঘটছে।
পুলিশ বলছে, একাধিক ভুয়ো চাকরি-সংস্থার পরিচয় দেখিয়ে মেয়েদের ভিন্ রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এখান থেকে। অনেক বড় ও প্রভাবশালী কোনও চক্র কাজ করছে এর পেছনে।