
শেষ আপডেট: 3 May 2019 17:03
'৯৯- এর সুপার সাইক্লোনের সময়ও আমি ভুবনেশ্বরে ছিলাম। ওই স্মৃতি এখনও মনে রয়েছে স্পষ্ট। কিন্তু শুক্রবার সাইক্লোন ফণী-র যা রূপ দেখলাম, তাতে মনে হল, এটা সুপার সাইক্লোনের থেকেও ভয়ঙ্কর।
মনে পড়ছে, সে বার মৃত্যু হয়েছিল নয় নয় করে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের। এ বার সেটা হয়নি ঠিকই। মাত্র তিন জনের মৃত্যুর খবর শুনেছি এখনও পর্যন্ত। কিন্তু এ বার ঘূর্ণিঝড়ের যে ভয়ঙ্কর রূপ দেখলাম, সেটা আগের সুপার সাইক্লোন, অথবা বছর দুয়েক আগে ওড়িশার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পিলিন, কোনওটাতেই দেখিনি।
সকাল ১১টা নাগাদ প্রথম ধাক্কাটা অনুভব করি। মিনিট পনেরোর মতো ছিল ঝোড়ো হাওয়ার দাপট। সেটা ছিল মারাত্মক। কিন্তু তখনও বুঝিনি এরপরে আরও ভয়ঙ্কর কিছু একটা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
প্রথম ধাক্কাটা কোনও মতে সামলে নিয়েছি বলে ভাবতে না ভাবতেই শুরু হল প্রকৃতির প্রলয় নাচ। বেলা সোয়া এগারোটা থেকে বাড়তে থাকল হাওয়ার দাপট। শোঁ শোঁ করে তীব্র আওয়াজ চারদিকে। সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। ওই সময় বাড়ির দরজাটা আপনা আপনি ধাক্কা খাচ্ছে দেখে সামাল দেওয়ার চেষ্টা শুরু করলাম। কিন্তু হাওয়ার ধাক্কায় মনে হচ্ছিল শুধু দরজা কেন, জানলাও যেন ফ্রেম থেকে খুলে বেরিয়ে আসবে। দেখলাম, বাড়ির চারপাশের জমিতে থাকা সমস্ত বড় বড় গাছগুলো মড়মড় শব্দ করে মাটিতে উপড়ে পড়তে শুরু করল। এ দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।
পাড়ার অনেক বাড়ি থেকেই তখন ভয় পাওয়া মানুষজনের কান্নার আওয়াজ উঠতে শুরু করেছে। সকলেই আতঙ্কে ভুগছেন। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে যাচ্ছে ঝোড়ো হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ। চারিদিকে লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে জিনিসপত্র, আসবাব। আমার সাধের পোষ্যটিও ভয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি শুরু করেছে। ওকে বাইরে বেরনো থেকে আটকাতে গিয়ে দরজা আর আটকানো যায়নি। বৃষ্টির তোড়ে ঘরের ভিতরের সব কিছু ভাসিয়ে দিয়ে গিয়েছে আজকের এই সাইক্লোন।
তবে সুপার সাইক্লোনেও চারিদিকে এত পাকা বাড়িঘর ভেঙে পড়তে দেখিনি। এত বিভীষিকা দেখিনি। সব দেখে মনে হচ্ছে এ বার ঝড়ের তীব্রতা অনেক বেশি। এমনকী ৯৯ সালের সুপার সাইক্লোন এতক্ষণ ধরে চলেওনি। তবে ফণীর দাপট মারাত্মক। বলা হয়েছিল তিন-চার ঘণ্টা ঝড় হবে। কিন্তু সকাল ১১টা থেকে টানা প্রায় ৭ ঘণ্টা ঝড়ের সঙ্গে যুঝতে হয়েছে আমাদের।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, পুরীতে যা গতি থাকবে তার চেয়ে ঝোড় হাওয়ার গতি কম হবে ভুবনেশ্বরে। পুরীতে যদি ১৮৫ কিলোমিটার বেগে বয়ে থাকে তবে এখানে তো আরও কম বেগে ঝড় বওয়ার কথা। কিন্তু চারপাশ দেখে মনে হচ্ছে তা আর হলো কই! এখনও যে আরও কত ক্ষয়ক্ষতি দেখতে হবে সেটা ভেবেই ভয়ে-আতঙ্কে সিঁটিয়ে যাচ্ছি আমরা।
লেখক শিক্ষা দফতরের অবসর প্রাপ্ত কর্মী