দ্য ওয়াল ব্যুরো: দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। এত দিনের পরিশ্রম, অধ্যবসায় হয়ত সফল হবে আজ মাঝরাতেই। সাক্ষী থাকবে কলকাতা। বাংলায় শুধু নয়, পূর্ব ভারতের প্রথম ফুসফুস প্রতিস্থাপন (Lung Transplant) হতে চলেছে মুকুন্দপুরের হাসপাতালে। করোনাকালে অঙ্গ প্রতিস্থাপনে নজির গড়েছে মহানগরী। এবার ফুসফুস প্রতিস্থাপনের মতো জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের নিদর্শন তৈরি হবে এ শহরেই।
সূত্রের খবর, মুকুন্দপুরের মেডিকা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন রোগী। তাঁর জন্য ফুসফুস নিয়ে আসা হচ্ছে গুজরাটের সুরাত থেকে। কলকাতা থেকে শল্য চিকিৎসকদের দল পৌঁছে গেছেন সুরাতে। সেখানে ব্রেথ ডেথ হয়ে যাওয়া এক রোগীর শরীর থেকে ফুসফুস সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষ বিমানে করে ফুসফুস কলকাতায় পৌঁছবে রাতে। বিমানবন্দর থেকে গ্রিন করিডর করে আনা হবে মেডিকায়। আজ মধ্যরাতেই হবেই অস্ত্রোপচার।
কলকাতা বিমানবন্দরে এখন থেকেই অ্যাম্বুল্যান্স ও অন্যান্য পরিষেবা রাখা হয়েছে। পুলিশের সাহায্যে গ্রিন করিডর করে রাত ১০টা নাগাদ ফুসফুস নিয়ে আসা হবে মেডিকা হাসপাতালে। চিকিৎসকরা সবরকম প্রস্তুতি সেরে রেখেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যভবন সূত্রে বলা হয়েছে, কোভিড পর্যায়ে ফুসফুস প্রতিস্থাপন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। কলকাতায় তথা বাংলায় এতদিন ফুসফুস প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো না থাকায় রোগীদের ভিন রাজ্যে যেতে হচ্ছিল। এই প্রথমবার ফুসফুস প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া হবে কলকাতাতেই। তার জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তার ও অস্ত্রোপচারের সবরকম পরিকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। এই অস্ত্রোপচার সফল হলে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ফুসফুস প্রতিস্থাপনের নজির তৈরি হবে।
যে রোগীর শরীরে ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হবে তিনি গত ১০৩ দিন ধরে ইকমো সাপোর্টে রয়েছেন। ইকমো হল ‘একস্ট্রা-কর্পোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজেনেশন’ পদ্ধতি। একে ‘একস্ট্রা-কর্পোরিয়াল লাইফ সাপোর্ট’ (ECLS) বলা হয়। হার্ট ও ফুসফুসের রোগে এই পদ্ধতির প্রয়োগ করেন ডাক্তাররা। শ্বাসপ্রশ্বাসে যখন স্বাভাবিক ভাবে অক্সিজেন ঢুকতে পারে না শরীরে, এমন ভেন্টিলেটরের মতো যান্ত্রিক পদ্ধতিতেও কাজ হয় না, তখন কৃত্রিমভাবে এই পদ্ধতিতে শরীরে অক্সিজেন ঢোকানো হয়।
কলকাতায় এতদিন কেন থমকে ছিল ফুসফুস প্রতিস্থাপন?
ইনস্টিটিউট অব পালমোকেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট ডাঃ পার্থসারথি ভট্টাচার্য দ্য ওয়ালকে আগেই বলেছিলেন, হৃদপিণ্ড, কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গ প্রতিস্থাপনের থেকে অনেকটাই জটিল ফুসফুস প্রতিস্থাপন। প্রথমত ‘ব্রেন ডেথ’ ব্যক্তির ফুসফুস যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্রিন করিডর করে নিয়ে গিয়ে প্রতিস্থাপন করার দরকার পড়ে। হাতে সময় থাকে চার থেকে ছ’ঘণ্টা। প্রতিস্থাপনের জন্য পরিকাঠামো, হাসপাতালের সেটআপ এবং প্রতিস্থাপন পরবর্তী সময় রোগীর শরীরে যে ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, এইসব কিছুর এখনও ঘাটতি রয়েছে কলকাতায়।
তাছাড়া ফুসফুস প্রতিস্থাপন করতে হলে লাইসেন্স দরকার হয়। স্বাস্থ্য দফতরের তরফে হাসপাতালের পরিকাঠামো খতিয়ে দেখে প্রতিস্থাপন কমিটির সঙ্গে আলোচনার পরেই এই লাইসেন্স দেওয়া হয়। কলকাতার অনেক হাসপাতালই এই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল ফুসফুস প্রতিস্থাপনের জন্য স্বাস্থ্য দফতরের অনুমতি পেয়েছে। একমাত্র সরকারি হাসপাতাল হিসাবে আগেই সেখানে কিডনি, লিভার, ত্বক প্রতিস্থাপন হত। এখন রাজ্যের একমাত্র ফুসফুস প্রতিস্থাপন কেন্দ্র হতে চলেছে এসএসকেএম।
কলকাতার বিশিষ্ট পালমোনোলজিস্ট, ফর্টিস হাসপাতালের রেসপিরেটারি মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাঃ অলোক গোপাল ঘোষাল বলেছেন, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সাফল্য নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপরে—
এক, হাসপাতাল,
দুই, হসপিটালিটি বা ম্যানেজমেন্ট। অঙ্গ প্রতিস্থাপন সহজ ব্যাপার নয়। আগে গোটা প্রক্রিয়াটা নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে তদারকি করতে হয়। ব্রেন ডেথ হয়েছে এমন রোগীর খোঁজ, মৃত রোগীর পরিবারকে অঙ্গদানের প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝানো, একই সঙ্গে রাজি করানো, অঙ্গ সংগ্রহ করা, তা হাসপাতালে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়ে আসা, পোস্ট-ট্রান্সপ্ল্যান্ট পর্বে রোগীর যত্ন-চিকিৎসা এই সবকিছুই একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে হওয়া উচিত। ঘাটতিটা সেখানেই হচ্ছে। তবে গত ১৫-২০ বছর আগে যা হত, সে তুলনায় এখন কলকাতায় অঙ্গ প্রতিস্থাপনের হার অনেক বেড়েছে। বলাবাহুল্য, গত তিন বছরে এ শহরে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য উন্নতি হয়েছে।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'