
শেষ আপডেট: 1 March 2020 02:00
ইস্টার্ন লোল্যান্ড গরিলা[/caption]
পাহাড়ি গরিলা মানে মাউন্টেন গরিলার জাতভাই হল ইস্টার্ন লোল্যান্ড গরিলা। কাছাকাছি বাংলা শব্দ হতে পারে বনমানুষ। আফ্রিকার কঙ্গোর (ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো) লোকজন এই প্রাণীটির মাংস খেতে বেশ পছন্দ করেন, তাঁরা মনে করেন এই মাংস বেশ স্বাস্থ্যকর ও উপাদেয়। গরিলাকে অন্য কোনও প্রাণী খায় না বলে একসময় মধ্যআফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বন জুড়ে এদের বিচরণ ছিল। মানুষের খাদ্যতালিকায় ঢুকে যাওয়ায় তিন দশকের মধ্যে এদের সংখ্যা ৭৭ শতাংশ কমে গেছে। এদের সংরক্ষণের কথা হচ্ছে, সরকারি ভাবে সংরক্ষণ শুরুও হয়েছে। সেসব করেও চোরাগোপ্তা শিকার বন্ধ করা যায়নি। ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোয় এই প্রাণীটির সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার আটশোয়।
রেড কলোবা বাঁদরমানুষ আর শিম্পাঞ্জির পেট ভরাতে গিয়ে এখন সঙ্কটে আফ্রিকার রেড কলোবা বাঁদর। মধ্য আফ্রিকার মানুষ এই প্রাণীটির মাংস খেতে খুব ভালবাসে। একবার শিকার করতে পারলে চামড়াটিও পাওয়া যায়। শিম্পাঞ্জি এমনিতে ফলমূল খেয়েই কাটিয়ে দেয় কিন্তু রেড কলোবা দেখলে তখন আর লোভ সামলাতে পারে না।
[caption id="attachment_191025" align="aligncenter" width="1280"]
রান্নার জন্য রাখা হয়েছে বনরুই[/caption]
এদেশের কথায় আসা যাক। আজকাল গ্রামের দিকে আর সেভাবে বনরুইয়ের দেখা পাওয়া যায় না। বনরুইকে ইংরেজিতে বলে প্যাঙ্গোলিন। এর মাংস খাওয়ার চল আদিবাসীদের মধ্যে রয়েছে। চিন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াতেও এর মাংস খায় মানুষ। আফ্রিকার লোকও খায়। এর আঁশ বাড়ির কাছে মাটিতে পুঁতে রাখলে নাকি হাঁপানি কমে, ক্যানসারের নিয়াময়ও নাকি হয়! মাংস ও আঁশের চাহিদার ফলে এই প্রাণীটির সংখ্যা বিশ্বজুড়ে বিপজ্জনক ভাবে কমেছে। বনরুই বা প্যাঙ্গোলিনের আটটি প্রজাতির মধ্যে চারটির সংখ্যা বেশ কমে গেছে, দুটি প্রজাতির বনরুই বিপন্ন এবং বাকি দুটি প্রজাতির বনরুই বিলুপ্তির পথে বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
চিন্তা রয়েছে কচ্ছপ নিয়েও। বিশ্বজুড়েই মানুষ কচ্ছপ খায়, সে স্থলের হোক বা জলের, নদীর হোক বা সমুদ্রের। আমাদের দেশে এদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এখন কচ্ছপ মারা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে তবে চোরাগোপ্তা শিকার বন্ধ হয়নি। অনেক সময় পাচার করার সময় উদ্ধার করা হয় কচ্ছপ। যেগুলি উদ্ধার হয় সেগুলিকে যথাস্থানে ছেড়ে দেওয়া হয়। যেগুলি উদ্ধার হয় না সেগুলি মানুষের পাতে পড়ে।
চিন ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন নদীতে পাওয়া যায় ইয়াংৎসে জায়ান্ট টার্টল, যার পিঠটি নরম। এটি সুখাদ্য বলে পরিচিত। তাই নির্বিচারে হত্যা করা হয় এই প্রাণীটিকে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী এই প্রজাতির আর মাত্র চারটি কচ্ছপ বেঁচে আছে।
[caption id="attachment_191028" align="aligncenter" width="2000"]
গ্রিন টার্টল[/caption]
গ্রিন টার্টলের সঙ্কট চরমে। সমুদ্রের উপকূল মানুষ দখল করে ফেলায় তারা ডিম পাড়ার জায়গা পায় না। যদিবা কোথাও ডিম পাড়ে, মানুষ গর্ত থেকে সেই ডিম বার করে খেয়ে ফেলে। এর মাংসও খাওয়ার জন্য এশিয়া মহাদেশে নির্বিচারে এই কচ্ছপ শিকার করা হয়। আফ্রিকাতে এই প্রাণী শিকার করা হয় পিঠের শক্ত খোলটির জন্য। আফ্রিকার বিভিন্ন অংশের মানুষ বিশ্বাস করেন যে এর খোলে আয়ুর্বেদিক শক্তি রয়েছে। ১৯৭৭ সাল থেকে এই প্রাণীটিকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা চলছে তবুও দিনে দিনে তারা বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
[caption id="attachment_191029" align="aligncenter" width="2400"]
ব্লুফিন টুনা[/caption]
জাপানিরা কি শুধু নিজেদের জীবন সঙ্কট করে ফুগু মাছ খায়? মোটেই না। তাদের সুশি আর সাশিমির জন্য প্রতি বছর কত যে টুনা মাছের প্রাণ যায়! স্রেফ এই জন্যই নীল পাখনাওয়ালা টুনা মাছ (ব্লুফিন টুনা) এখন বিলুপ্তির পথে।
আমাদের চমরিগাইয়ের মতো উত্তর আমেরিকায় রয়েছে মাস্কঅক্স। বহু কাল ধরে আমেরিকার আদিবাসীদের খাবার জুগিয়ে এসেছে এই প্রাণীটি। তবে পরিস্থিতি বদলে যায় ইউরোপীয়রা হাজির হওয়ার পরে। বীরত্ব দেখাতে গুলি করে তারা নির্বিচারে মারতে শুরু করে এই বন্যপ্রাণীটিকে। এর মাংসও খেতে থাকে। ১৯০০ থেকে ১৯৩০-এর মধ্যে প্রাণীটি বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যায়। বর্তমানে অবশ্য এদের সংখ্যা ৮০ হাজার মতো।
[caption id="attachment_191030" align="aligncenter" width="3718"]
মাস্কঅক্স[/caption]
পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে গোলাপী মাথা হাঁস। একসময় নালায় সাঁতরে বেড়ানো চ্যাঙ মাছ আজকাল আর দেখাই যায় না। কমে যাওয়ার জন্য মহার্ঘ্য হয়ে গেছে শিঙি, দেশি মাগুর, কই, কাঁচকি, দেশি পুঁটি প্রভৃতি মাছ।
এই তালিকা লম্বা। মানুষের রসনা তৃপ্ত করতে স্থলচর ৩০১টি প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর অস্তিত্ব এখন বিপন্ন। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নির্বিচারে মাছ ধরার জন্য ১৪১৪টি প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্তির পথে।
[caption id="attachment_191031" align="aligncenter" width="1000"]
স্টারজিয়ন মাছের বাজার[/caption]
কুড়ি কোটি বছর ধরে বিচরণ করে আসা স্টারজিয়ন মাছ এখন প্রায় বিলুপ্ত। মূলত ডিমের জন্যই এর এত চাহিদা। এই মাছের ডিম থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি খাবারের একটি তৈরি হয়, খাবারটির নাম ক্যাভিয়ার যার দাম ৪৫০০ পাউন্ড। তুর্কমেনিস্তানে এই মাছের চাহিদা বিপুল। সম্প্রতি এই মাছের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা কিছুটা সফল হয়েছে। তাও এরা এখন বিপন্ন।
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচারের হিসাব অনুযায়ী মানুষ গড়ে এক বছরে ৪২ পাউন্ড মাছ খায়, ৫০ বছর আগে মানুষ যে পরিমাণ মাছ খেত এখন তার দ্বিগুণ পরিমাণে খায়। পাঁচ মহাসাগরের ৬০ শতাংশ মাছ মানুষ খেয়ে ফেলেছে এই পঞ্চাশ বছরে। এখনও খেয়ে চলেছে। এভাবে সামুদ্রিক মাছ খেতে থাকলে পঞ্চাশ বছর পরে আর সামুদ্রিক মাছ বলে কিছু থাকবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।