দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিড সংক্রমণ এখন আর ফুসফুসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হার্ট ও মস্তিষ্ককেও সংক্রামিত করছে নানা ভাবে। নিউরোলজিস্টরা বলছেন, করোনাভাইরাস শরীরে ঢুকলে তীব্র আঘাত হানছে মস্তিষ্কে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্রেন ড্যামেজ’ হচ্ছে। মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছনো বন্ধ হচ্ছে, কখনও জমাট বাঁধছে রক্ত, তৈরি হচ্ছে তীব্র প্রদাহ এবং এর থেকেই স্মৃতিনাশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
‘অ্যালঝাইমার্স ডিজিজ’ সায়েন্স জার্নালে আজ একটি গবেষণার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে নিউরোলজিস্টরা কোভিড সংক্রমণে কীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি হচ্ছে বা হতে পারে তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ভাইরাস সংক্রামিত রোগীদের এমআরআই করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন কোভিড রোগীদের পর্যবেক্ষণে রেখে তাদের শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেই এমন তথ্য দিয়েছেন নিউরোলজিস্টরা।
কোভিড সংক্রমণ তিনভাবে ‘ব্রেন ড্যামেজ’ করছে, দাবি নিউরোলজিস্টদের
এপিথেলিয়াল কোষ আক্রান্ত
সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেন মূলত নাক, মুখ বা গলার মাধ্যমেই শরীরে প্রবেশ করে। গবেষকরা বলছেন, নাক বা গলার গবলেট কোষকে টার্গেট করে করোনা। কারণ এই কোষের মধ্যেই তাদের ‘বন্ধু’ রিসেপটর প্রোটিন ACE-2 থাকে। এই প্রোটিনের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে শ্বাসনালীর মাধ্যমে সোজা ফুসফুসে চলে আসে ভাইরাস। এরপর তার কাজ হয় প্রতিলিপি তৈরি করে ফুসফুসে সংখ্যায় বাড়তে থাকা এবং একই সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া। গোটা শ্বাসযন্ত্রকেই নিজের কব্জায় এনে ফেললে শরীরে অক্সিজেন ঢোকার প্রক্রিয়া বন্ধ হতে শুরু করে। সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হন রোগী। আরও একটা ব্যাপার ঘটে, সেটা হল মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
গবেষকরা বলছেন, এর ফলে মস্তিষ্ক আর সিগন্যাল পাঠাতে পারে না সারা শরীরে। যার কারণে প্রথমেই নাকের গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা, মুখের স্বাদকোরকের সেন্স চলে যেতে থাকে। করোনার এই দুই উপসর্গকে চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। ভারতেও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের করোনা প্রোটোকলে এই দুই উপসর্গের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিউরোলজিস্টরা বলছেন, ব্রেন ড্যামেজের এটাও একটা লক্ষণ। কারণ শরীরের স্নায়ু কোষ
(Olfactory Cells) জেগে উঠেই মস্তিষ্কে বার্তা পৌঁছে দেয়। গন্ধের যে অনুভূতি সেটা এই কোষ বাহিত হয়েই ব্রেনে পৌঁছয়। মারণ ভাইরাস এই সিস্টেমকেই নষ্ট করে দেয়। ফলে গন্ধ নিতে পারার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারাতে থাকে রোগীরা। এই রোগকেই বলে
অ্যানোসমিয়া (Anosmia) । স্বাদকোরকের ক্ষমতা চলে যাওয়া বা স্বাদহীনতা রোগ
অ্যাগিউসিয়া (Ageusia)-র কারণও সেই একই।
সাইটোকাইন স্টর্ম তীব্র প্রদাহ তৈরি করে, রক্ত জমাট বাঁধে মস্তিষ্কে
ভাইরাল প্রোটিন বা অ্যান্টিজেন শরীরে ঢুকে সাইটোকাইন প্রোটিনের ক্ষরণ অনেকটাই বাড়িয়ে দিচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, এই সাইটোকাইন প্রোটিনের কাজ হল বাইরে থেকে কোনও সংক্রামক ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা প্যাথোজেন ঢুকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কোষে সেই বিপদ সঙ্কেত পৌঁছে দেওয়া। অজানা সংক্রামক প্রোটিন দেখলেই ঝড়ের গতিতে কোষে কোষে বিপদবার্তা পৌঁছে দেয় এই সাইটোকাইন প্রোটিন। এই প্রোটিন ক্ষরণেরও একটা নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। যদি দেখা যায় সাইটোকাইন ক্ষরণ বেশি হচ্ছে বা কম হচ্ছে তাহলে ভারসাম্য বিগড়ে যায়। করোনার সংক্রমণে এই সাইটোকাইনের ক্ষরণ প্রয়োজনের থেকে বেশি হচ্ছে। এত বেশি প্রোটিন নিঃসৃত হচ্ছে যে বিপদবার্তা পৌঁছে দেওয়ার বদলে সে নিজেই কোষের ক্ষতি করে ফেলছে। এই ঘটনাকে বলা হচ্ছে সাইটোকাইন ঝড় (Cytokine Storm)। এর প্রভাবে তীব্র প্রদাহজনিত রোগ তৈরি হচ্ছে শরীরে।

গবেষকরা বলছেন এই প্রদাহজনিত রোগের কারণেই শরীরের নানা অঙ্গে রক্ত জমাট বাঁধছে। এমনকি মস্তিষ্কেও ব্লাড ক্লট দেখা যাচ্ছে। যার পরিণতি ব্রেন স্ট্রোক হতে পারে। রোগী কোমায় চলে যেতে পারে।
স্মৃতিনাশের শঙ্কাও বাড়ছে কি?
করোনার নতুন উপসর্গগুলির মধ্যে মানসিক অবসাদ, ভুল বকা, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ইত্যাদিরও উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ও আন্তর্জাতিক সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)।

নিউরোলজিস্টরা বলছেন, এরও কারণ হতে পারে সাইটোকাইন প্রোটিনের মাত্রাতিরিক্ত ক্ষরণ এবং রক্ত চলাচল বাধা পাওয়া। মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের রিপোর্ট বলছে, গত এক সপ্তাহে ৩২ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন যাঁদের মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধেছিল। এই রোগীরা প্রত্যেকেই করোনা পজিটিভ ছিলেন। এদের মধ্যে পাঁচজনের বয়স চল্লিশ বছরের নীচে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে এই রোগীদের হার্টের কোনও সমস্যাই ছিল না, এমনকি শরীরে অন্য কোনও ক্রনিক রোগও ছিল না।