দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেটা ২০১৪ সাল। পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ ইউপিএ-২ সরকারের বিরুদ্ধে। মনমোহন সিং সরকারকে ল্যাজেগোবরে করতে তখন নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা নিয়ম করে এ রাজা, কানিমোঝি, সুরেশ কালমাদিদের নামে বিষোদগার করছেন। জনমানসের ক্ষোভের কথা আন্দাজ করেই সেই সময়ে মোদী-শাহ বলেছিলেন, কংগ্রেস মুক্ত ভারত গড়বেন।
২০১৯ শেষ হতে কয়েকদিন মাত্র বাকি। বছরের শেষ মাসের শেষের দিকে এসে দেখা গেল কংগ্রেসমুক্ত ভারত হওয়া অনেক দূরের কথা, সর্বভারতীয় রাজনীতির মানচিত্রে ক্রমশ ফিকে হচ্ছে গেরুয়া রঙের ছটা। মহারাষ্ট্র হাতছাড়া হওয়ার পরই বোঝা যাচ্ছিল ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে গেরুয়া প্রলেপ ফিকে উঠছে। ঝাড়খণ্ডে ভরাডুবির পর যেন আরও এক পোচ গেরুয়া রঙ উঠে গেল। একইসঙ্গে ভারতের ম্যাপে এখন নানা রঙের সমাহার। কোথাও নীল, কোথাও সবুজ, আবার কোথাও লাল।
২০১৭ সালের মানচিত্র আর ১৯-এর ডিসেম্বরের মানচিত্রের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কোথাও সন্মুখ সমরে কংগ্রেসের কাছে পর্যুদস্ত হয়েছে বিজেপি। যেখানে সনিয়া-রাহুল তাদের হারাতে পারেননি, সেখানে মোদী-অমিত শাহকে রুখে দিতে অনুঘটকের ভূমিকা নিচ্ছেন। এমনকি রাজনৈতিক ভাবে ভিন্ন মেরুতে থাকা দলকেও সমর্থন দিতেও দ্বিধা করেনি দশ নম্বর জনপথ এবং সে ক্ষেত্রে ফর্মুলাটা বাংলায় সিপিএম-কংগ্রেস জোটের মতোই। তৃণমূলকে হারাতে পুরনো বিরোধ ঝেড়ে ফেলে সোমেন মিত্র-সূর্যকান্ত মিশ্ররা যেমন এককাট্টা।
মোদীর প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে প্রথমে পাঞ্জাবে ক্ষমতাচ্যূত হয় এনডিএ। পরে গত বছর ডিসেম্বর মাসে আরও বড় ধাক্কা খায় বিজেপি। হিন্দি বলয়েই বিজেপির পায়ের তলার মাটি সরে যায়। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড় এবং রাজস্থানের ভোটে হারতে হয়েছিল মোদী-শাহ জুটিকে। তারপর লোকসভা ভোটে বিজেপির বিপুল জয় দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, ওটা ছিল ব্যতিক্রম। একাই ৩০০ পেরিয়ে যাওয়া বিজেপিকে আর কে ধরবে! কিন্তু সেই ধারণায় জল ঢেলে দিয়েছে অক্টোবরের শেষে হওয়া হরিয়ানা আর মহারাষ্ট্রের নির্বাচন। এদিন ঝাড়খণ্ডের ফলাফল যেন তাতে আরও এক বালতি জল ঢেলে দিল। আদিবাসী অধ্যুষিত রাজ্যে মুখ থুবড়ে পড়ল গেরুয়া রথ।
সর্বভারতীয় মানচিত্রে এখনও রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি তথা এনডিএ। গুজরাত, বিহার, কর্নাটক, অসম ও উত্তরপ্রদেশ। হিমাচল, উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যগুলির রাজনৈতিক ওজন সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তেমন অবশ্যই নয়। ঝাড়খণ্ডেরও যে খুব গুরুত্ব ছিল তা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক নাগরিকত্ব আইন ও এনআরসি বিরোধী আন্দোলন যে ভাবে সারা দেশে ঝড় তুলেছে, সেখানে ছোট রাজ্যের নির্বাচনটাও সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে বড় হয়ে উঠেছিল।
পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, ২০১৯-এর ডিসেম্বরে যে ম্যাপটা দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যেও জল রয়েছে। তাঁদের মতে, কর্নাটক, মণিপুর এবং গোয়ার মতো রাজ্যগুলিতেও সরকার গড়তে নীতি-নৈতিকতার কোনও বালাই ছিলনা বিজেপির। ওই রাজ্যগুলিতে শরদ পাওয়ার, উদ্ধব ঠাকরেদের মতো ক্ষুরধার মস্তিষ্কের বিরোধী নেতা নেই বলে এখনও টিকে রয়েছে গেরুয়া দল। না হলে সেগুলোও থাকত না।
তবে সন্দেহ নেই, গত দু’বছরে উত্তর-পূর্বে একচেটিয়া শক্তি বেড়েছে বিজেপির। ত্রিপুরায় কমিউনিস্ট সরকার হঠিয়ে দেওয়া বা অসমে সরকার গড়েছে গেরুয়া শিবির। মানচিত্রতেও পরিষ্কার, গোটা উত্তর-পূর্বই প্রায় গেরুয়া হয়ে গিয়েছে। যা চিরাচরিত ভাবে বিজেপির ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই বলছেন, জাতীয় স্তরে নরেন্দ্র মোদীর মুখ দেখিয়ে বিজেপি ভোট পেলেও রাজ্য স্তরের নির্বাচনে মোদী-ম্যাজিক করছে না। একের পর এক নির্বাচনে সেটাই স্পষ্ট হয়েছে। তার চেয়ে বরং বিজেপির রাজ্য নেতাদের কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছেন কংগ্রেসের আঞ্চলিক নেতারা। কোথাও তিনি কমলনাথ, কোথাও অশোক গেহলট বা কোথাও ভূপেশ বাঘেল। যেখানে কংগ্রেস শক্তিশালী নয়, সেখানে হেমন্ত সোরেনের মতো নেতারা টক্কর দিচ্ছেন রঘুবর দাসদের।
মহারাষ্ট্রে বিপর্যয়ের পর পর্যবেক্ষকদের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন ঝাড়খণ্ড নিয়ে। হলও তাই। আরও একটা রাজ্যের কুর্সি চলে গেল বিজেপির হাত থেকে। আরও একটা রাজ্য থেকে উঠে গেল গেরুয়া প্রলেপ।