
শেষ আপডেট: 2 March 2024 12:49
প্রায় ৬ ফুট লম্বা মানুষটার দেহ যখন কোপাচ্ছিল তালিবানরা হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল জাহানারা (নাম পরিবর্তিত)। চোখের সামনে নিজের স্বামীকে শত টুকরো হতে দেখেছিলেন। ‘অপরাধ’ একটাই। জঙ্গি দলে নাম লেখাতে চাননি স্বামী। বাড়ি এসে কুপিয়ে গিয়েছিল তালিবানরা। ছাড় পাননি তিনিও। চুলের মুঠি ধরে বেধড়ক মার, ধর্ষণ। তালিবানদের দাপটে আফগানিস্তানের একটা প্রত্যন্ত গ্রাম তখন প্রায় পুরুষশূন্য। জাহানারার মতোই ঘরহারা মহিলারা দিনের পর দিন তালিবান জঙ্গিদের নিপীড়নের শিকার।
একদিন গভীর রাতে সাহস করে বাড়ির চৌকাঠ পেরোলেন তাঁরা। রুক্ষ, বন্ধুর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কী ভাবে যে ভারতে এসে পৌঁছেছিলেন সেটা রহস্যই থাক। বলতে চান না কেউই। তবে এই মহিলারা এখন স্বাধীন। রাজধানীতে তাঁদের বড় ব্যবসা। পাশে দাঁড়িয়েছে ভারতেরই নানা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ইলহাম (Ilham)। দিল্লিতে মহিলাদের কেটারিং সার্ভিস। চালান উদ্বাস্তু আফগান মহিলারাই। তাঁদের নিজস্ব খাবারের স্টলও আছে। দিল্লির নানা জায়গায় ফুড ফেস্টিভালে প্রদর্শনীও হয়। আফগান পোলাও, নার্গিসি কাবাব, মান্থুর স্বাদ চাখতে ভিড় জমান বিচারক, রাজনীতিবিদ, খেলোয়াড় থেকে আমজনতা। এই কেটারিং-এর খাবার পৌঁছে যায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, মার্কিন দূতাবাস, সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ থেকে দিল্লি ইউনিভার্সিটির কলেজে কলেজে।

ঘরের চৌকাঠের বাইরে পা রাখার অনুমতি ছিল না যে অফগান মহিলাদের, তাঁরাই এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। জাহানারারা ‘কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ’ সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেনেন। তালিবানদের বন্দুকের সামনে যিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। আফগানিস্তানে ‘সাহাবকামাল’ নামে পরিচিত সুস্মিতাকে ২০ বার গুলি করা হয়েছিল। উপড়ে নেওয়া হয়েছিল মাথার বেশ কিছু চুল। জীবনের প্রতিটি দুঃস্বপ্ন ফুটিয়ে তুলেছিলেন ‘কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ’ বইতে। এই বই একসময় নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে। সুস্মিতার মতো লিখতে পারেন না জাহানারারা। তবে তাঁদের জীবনের গল্পও অনেকটা একই রকম। সুস্মিতা বাঁচেননি, কিন্তু জাহানারারা মুক্তির আলো দেখেছেন। ভারতের মাটিতেই নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছেন।
আরবী ভাষায় ইলহাম কথার অর্থ প্রেরণা দেওয়া। নিঃস্ব, রিক্ত হয়েও যাঁরা বাঁচার আলো খুঁজে পান, তাঁরাই ইলহাম। এই মহিলারা নিজেদের আর এখন আফগান বলে ভাবেন না। এখন তাঁরা ভারতীয়। মাতৃভূমির স্মৃতি জেগে আছে শুধু রান্নার স্বাদে। রেঁধে আর খাইয়েই তাঁদের প্রাণের আরাম। পরিবার হারানোর যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি।
দেশের মাটিতে দিশাহারা উদ্বাস্তু আফগান মহিলাদের খুঁজে বার করেছিলেন তিনিই। ‘অ্যাকসেস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস’ নামে একটি এনজিও-র হয়ে কাজ করেন অদিতি। এই এনজিওটি ‘ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজি’ (UNHCR) –এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে। ২০১৫ সালে ‘প্রজেক্ট লাইভলিহুড’ (Project Livelihood) নামে একটি প্রকল্পের হয়ে কাজ করছিলেন অদিতি। সেই সময়েই উদ্বাস্ত আফগান মহিলাদের স্বনির্ভর করে তোলার ভাবনা তাঁর মাথায় আসে। অদিতি জানিয়েছেন, এই মহিলাদের অক্ষরজ্ঞান ছিল না। তার উপর তালিবানদের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রত্যেকেই ট্রমার মধ্যে ছিলেন। ভারতে আশ্রয় নিয়েও তাঁদের ভয় যায়নি। তাই এই মহিলাদের স্বনির্ভর করে জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনাটা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এখন অঁরা প্রত্যেকেই ভারতীয় আদবকায়দায় অভ্যস্ত। ভাষাতেও অনেক স্বচ্ছন্দ। ব্যবসায়িক বুদ্ধিও তৈরি হয়েছে। এটা আমার নয়, দেশের জয়।
ইলহাম তৈরি হয় ২০১৫ সালেই। প্রথম আটজনকে নিয়ে খাবারের স্টল খুলেছিলেন অদিতি। সাতজন সিঙ্গল মাদার। একজন হারিয়েছেন সন্তানকে। স্বামীর সঙ্গে সন্তানকেও কুপিয়ে মেরেছিল তালিবানরা। অদিতি জানিয়েছেন, এই চারজনেরই রান্নার হাত ছিল অপূর্ব। তাই খাবার তৈরি করে ব্যবসা শুরুর কথা প্রথম মনে হয়।
দিল্লির একটি ফুড ফেস্টিভালে আফগান মহিলাদের হাতের জাদু সকলকে মুগ্ধ করে। পথ চলার সেই শুরু। এর পর রাজধানীর নানা জায়গায় ছোট ছোট খাবারের স্টল তৈরি করেন অদিতি। রাঁধুনীর সংখ্যা চারজন থেকে বেড়ে যায় ৫০ জনে। সকলেই তালিবান শাসনে ঘরহারা, আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু। তৈরি হয় ইলহাম। শুরুটা অদিতি করেছিলেন। ২০১৭ সাল থেকে আফগান মহিলারা নিজেরাই ইলহামের দায়িত্ব নিয়েছেন।
নারগিসি পোলাও, শামি কাবাব ইলহামের সেরা আকর্ষণ। কাবুলি, নোরাঞ্জ পোলাও, মান্থু আফগান ডেলিকেসির স্বাদ পৌঁছে গেছে মার্কিন দূতাবাসে, ইউরোপিয়ান সেন্টারে। জাসন-এ-রেখতা, দিল্লির ফুড ট্র্যাক ফেস্টিভাল, বিকানের হাউজ সানডে মার্কেট, দিল্লি ইউনিভার্সিটি সব জায়গাতেই ইলহামের নাম। শুধু কেটারিং সার্ভিস নয়, ইলহাম এখন একটা সংগঠন যার হাল ধরেছেন ঘরহারারা। আফগান মহিলাদের পাশাপাশি দেশের অনেক সিঙ্গল মাদাররাও এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সব হারিয়ে যাঁরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, তাঁদেরই মাথা গোঁজার আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইলহাম।
এই সংগঠনে এখন সদস্য সংখ্যা প্রায় ৭০০। ইলহামের অনলাইন ফুড পোর্টালও খোলা হয়েছে। এদের নিজস্ব হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে, সেখানে খাবার অর্ডার দেওয়া যায়। ইলহামের মহিলাদের আইটি-র তালিম দিচ্ছেন পঙ্কজ নন্দা। জানিয়েছেন, এই মহিলারা এখন খাবারের প্রেজেন্টেশন দিতে পারেন। একটা বড় প্রদর্শনী সামলাতে পারেন। প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে তোলা হচ্ছে তাঁদের।
গত বছর মার্চে ইলহামকে ‘Best Women Entrepreneurs’ পুরস্কার দেয় দিল্লির ফুড ওয়াকস এবং আমেরিকান সেন্টার। ইলহামের দক্ষতাকে কুর্নিশ জানিয়েছে ইউনাইটেড নেশনস ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম। “আমার রান্নার প্রশংসা করতেন স্বামী। চেয়েছিলেন আমরা একটা রেস্তোরাঁ খুলি। সেটা আর হল না। সৎভাবে বাঁচার চেষ্টাকে মেনে নিতে পারেনি তালিবানরা,” এখনও চোখের জল ফেলেন জাহানারা। অন্যকে পোলাও খাইয়েই মনের তৃপ্তি খুঁজে পান।