শুক্রবার চন্দননগরের রাজবিহারী বসু রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত নানা সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

শেষ আপডেট: 12 September 2025 19:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো, হুগলি: সাবেক ফরাসডাঙা একসময় শুধু শিল্প-সংস্কৃতির আঁতুরঘরই নয়, ছিল বিপ্লবীদের আঁতুড়ঘরও। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের আগুন একসময় দাউদাউ করে জ্বলেছিল এই শহরের গলিপথে। রাসবিহারী বসু, কানাইলাল দত্ত, মাখনলাল ঘোষাল, এঁদের শৈশব ও তরুণ বয়স কেটেছে চন্দননগরের বুকেই। গড়ে উঠেছিল অনুশীলন সমিতির মতো একাধিক গুপ্ত সংগঠন, যেখানে রাতের অন্ধকারে গোপনে চলত ট্রেনিং, অস্ত্রের মহড়া আর স্বাধীনতার পথের খোঁজ। সেই ইতিহাস আজ অনেকটাই বিস্মৃত। এই অসংখ্য বিস্মৃত ইতিহাস, ধ্বংস হতে থাকা নথি, আর স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু অজানা অধ্যায়— এগুলোকে সংরক্ষণ ও একত্রিত করার প্রয়াসে শনিবার চন্দননগরে এলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল।
শুক্রবার চন্দননগরের রাজবিহারী বসু রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত নানা সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইতিহাস শুধু বাংলাতেই নয়, ভারতের নানা রাজ্যে ছড়িয়ে আছে। এমনকি ঢাকায় অনুশীলন সমিতির কার্যালয় ছিল। এইসব দলিল, কাগজ, প্রামাণ্য নথি সংরক্ষণ করা জরুরি।”
সঞ্জীববাবু জানান, তাঁর নিজের পরিবারও স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত ছিল। পিতৃকূল ও মাতৃকূল উভয় দিকের আত্মীয়রা বৃটিশদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। তাই ব্যক্তিগত আবেগও রয়েছে এই কাজের সঙ্গে। তিনি বলেন, “ছোট ছোট সমস্ত সংগঠনকে একত্রিত করা হচ্ছে। বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের বিস্তার কতটা ছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে। বহু কিছু আমি নিজেও আজ চন্দননগরে এসে জানতে পারলাম।"
আলোচনার ফাঁকে বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু বলেন, “বছরখানেক আগে আমি সঞ্জীববাবুকে বলেছিলাম চন্দননগরের বিপ্লবী ইতিহাসের কথা। এখনও অনেক কিছু ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। এগুলোকে রক্ষা করা জরুরি।” জবাবে সঞ্জীব সান্যাল বলেন, “অর্থের অভাব নেই, দরকার শুধু সদিচ্ছা। সবাই এগিয়ে এলে এই কাজ সম্ভব।”
রাজবিহারী বসু রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা কল্যাণ চক্রবর্তী জানান, “দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে আমরা চেষ্টা করছি রাসবিহারী বসুর জীবন ও কর্মকাণ্ডকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে। এবছর কেন্দ্র সরকারও ‘লিগ্যাসি অফ রাজবিহারী বসু’ শীর্ষক প্রচার চালাচ্ছে। উদ্দেশ্য, তাঁর কর্মধারা দেশবাসী ও বিশ্বের সামনে পৌঁছে দেওয়া। চন্দননগরে ছোট ছোট অনেক সংগঠন এখনও স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছে। যদি সবাইকে এক ছাতার তলায় আনা যায়, তবে আরও বড় ইতিহাসের সন্ধান মিলবে।”
শনিবার দিনভর সঞ্জীব সান্যাল ঘুরে দেখেন রাজবিহারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট, প্রবর্তক আশ্রম ও চন্দননগরের অন্যান্য বিপ্লবতীর্থ। তাঁর কথায়, “যা দেখলাম ও শুনলাম, সেটি শুধু চন্দননগর নয়, গোটা দেশের ইতিহাসের সম্পদ। এগুলোকে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বিপ্লবীদের আসল চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হবে।”
একসময়ের ফরাসডাঙা আজ নিছক একটি শহর, কিন্তু তার গলি–ঘুপচি, পুরনো দালান, আর্কাইভে লুকিয়ে আছে স্বাধীনতার উত্তাল দিনগুলোর সাক্ষ্য। সঞ্জীব সান্যালের এই উদ্যোগ কি তবে সেই বিস্মৃত ইতিহাসকে নতুন করে দেশের মানচিত্রে ফিরিয়ে আনবে? উত্তর দেবে সময়।