
চরকা-বুড়ি মানদা বসাক। ছবিটি এআই-এর সাহায্যে এডিট করা হয়েছে।
শেষ আপডেট: 31 October 2025 18:26
জ্যোৎস্নারাতে সেই ছোট্ট ভাঙা টিনের ঘরে যেন সত্যিই ধরা দেয় লক্ষ কোটি তারার আলো। সেই আলোয় যখন পুরনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে আনমনে বসেন মানদা, তখন মনে হয় যেন সত্যিই সেই রূপকথার চাঁদের বুড়ি ধরা দিয়েছেন মর্ত্যে। তাঁর হাতেও সেই চরকা— কিন্তু গল্পের নয়, বাস্তবের।
নদিয়ার ফুলিয়ার শতবর্ষী মানদা বসাকের জীবনটা সত্যিই যেন রূপকথা। আজও চরকায় সুতো কাটেন তিনি। খালি চোখে। শত বছর পেরিয়ে এসেও আঙুলের ছন্দ, মনোযোগ, আর সেই নিঃশব্দ ভালবাসা— কিছুই কমেনি।
গ্রামের মানুষও তাঁকে ভালবেসে ডাকেন 'চরকাবুড়ি' নামে। নামের মধ্যেই যেন মিশে আছে এক ছবি। রাত্রি জুড়ে চরকা কাটেন এক বৃদ্ধা, আলো ছড়ান নীরবে।
দেশভাগের আগে মানদা দেবী ছিলেন বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। বারো বছর বয়সে বিয়ে, তারপর তিন ছেলে, তিন মেয়েকে নিয়ে গৃহস্থ জীবন। কিন্তু দেশভাগের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল সেই সুখের দিনগুলো।
স্বামী মারা গেলেন অকালেই। জীবনের ভার এসে পড়ল একা মহিলার কাঁধে। চারপাশে অনিশ্চয়তা, ভাঙা ঘর, ক্ষুধার্ত মুখ— আর একটিই ভরসা, সেই চরকা।

মানদার হাতের চরকা তখন শুধু সুতোর আহ্লাদ নয়, সংসারেরও দড়িও বটে। ওই চক্রের ঘূর্ণনে ঘুরত সংসার, বাঁচত বাচ্চারা।
ছোটবেলা থেকেই সুতোর কাজে দক্ষ ছিলেন মানদা। স্বাধীনতার আগের যুগে চরকায় বসেই সংসার চালাতেন, স্বপ্ন বুনতেন।
সেই থেকে আজ তাঁর বয়স একশো পেরিয়েছে। চোখের দৃষ্টি অনেকটাই কমেছে, পা চলে লাঠির ভর দিয়ে, তবু যখন চরকা কাটতে শুরু করেন, মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে।

ছেলেরা বলেন, “মাকে আমরা বিশ্রাম নিতে বলি, কিন্তু তিনি শোনেন না। চরকা যেন তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস।” আর মানদার মুখে এক চিলতে হাসি— “যতদিন প্রাণ আছে, চরকাই আমার সঙ্গী।”
স্বাধীনতার পরেও কেটেছে চরম দারিদ্র্যের দিন। কখনও টিনের ছাদ চুঁইয়ে জল পড়েছে, কখনও আধার কার্ডের সমস্যায় থমকে গেছে সরকারি সাহায্য। অসংখ্যবার কর্তৃপক্ষ এলেও সরকারি ঘর আজও পাননি। কিন্তু তাঁর আক্ষেপে নেই হতাশার ছোঁয়া।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিশু ও নারী বিকাশ সমাজকল্যাণ দফতরের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মান জানানো হয়েছে। ‘নারী সম্মান’-এর সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে শতবর্ষী মানোদা যখন সার্টিফিকেট হাতে নিলেন, হাসলেন চুপচাপ— যেন বললেন, “এই সম্মান শুধু আমার নয়, সেই চরকারও।”
মানদা বসাক শুধু এক বৃদ্ধা নন, তিনি এক ইতিহাসের সাক্ষী। স্বাধীনতার আগে থেকে আজ পর্যন্ত চরকার শব্দে জেগে থাকা এক নারী। যে চরকা একদিন মহাত্মা গান্ধীর হাতে প্রতিবাদের প্রতীক ছিল, সেই চরকাই মানদার হাতে বেঁচে আছে শ্রমের, মর্যাদার, এবং আত্মসম্মানের প্রতীক হয়ে।

রসপুর, ফুলিয়া, ময়মনসিংহ— এই তিনটি নাম এখন একসূত্রে বাঁধা মানদার হাতে। রাত্রে যখন ভাঙা টিনের ঘরে চাঁদের আলো পড়ে, দূর থেকে শোনা যায় চরকার নরম শব্দ, সেই শব্দে মিশে যায় একশো বছরের ইতিহাস, এক নারীর দৃঢ়তা, আর সেই পুরনো রূপকথার সুর—