Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
নিজেকে ‘যিশু’ সাজিয়ে পোস্ট! তীব্র বিতর্কের মুখে ছবি মুছলেন ট্রাম্প, সাফাই দিয়ে কী বললেন?IPL 2026: পয়লা ওভারেই ৩ উইকেট, স্বপ্নের আইপিএল অভিষেক! কে এই প্রফুল্ল হিঙ্গে?ইরান-মার্কিন বৈঠক ব্যর্থ নেতানিয়াহুর ফোনে! ট্রাম্পের প্রতিনিধিকে কী এমন বলেছিলেন, খোলসা করলেন নিজেইWeather: পয়লা বৈশাখে ঘামঝরা আবহাওয়া! দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহের হলুদ সতর্কতা, আবার কবে বৃষ্টি?হরমুজ ঘিরে ফেলল মার্কিন সেনা! ইরানের 'শ্বাসরোধ' করতে ঝুঁকির মুখে আমেরিকাও, চাপে বিশ্ব অর্থনীতি'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকেরভোটের মুখে ইডির বড় পদক্ষেপ! কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ চান্ডেলমহাকাশে হবে ক্যানসারের চিকিৎসা! ল্যাবের সরঞ্জাম নিয়ে পাড়ি দিল নাসার ‘সিগনাস এক্সএল’সঞ্জু-রোহিতদের পেছনে ফেলে শীর্ষে অভিষেক! রেকর্ড গড়েও কেন মন খারাপ হায়দ্রাবাদ শিবিরের?আইপিএল ২০২৬-এর সূচিতে হঠাৎ বদল! নির্বাচনের কারণে এই ম্যাচের ভেন্যু বদলে দিল বিসিসিআই

ঠিক যেন রূপকথা! ভাঙা ঘরে চরকা কাটেন 'চাঁদের বুড়ি' মানদা, ইতিহাস বোনা হয় ফুলিয়ার শতবর্ষীর হাতে

ঠিক যেন রূপকথা! ভাঙা ঘরে চরকা কাটেন 'চাঁদের বুড়ি' মানদা, ইতিহাস বোনা হয় ফুলিয়ার শতবর্ষীর হাতে

চরকা-বুড়ি মানদা বসাক। ছবিটি এআই-এর সাহায্যে এডিট করা হয়েছে।

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: 31 October 2025 18:26

কাজল বসাক
ফুলিয়া

"এক যে ছিল চাঁদের কোণায়
         চরকা-কাটা বুড়ি  
পুরাণে তার বয়স লেখে
         সাতশো হাজার কুড়ি।
সাদা সুতোয় জাল বোনে সে
         হয় না বুনন সারা
পণ ছিল তার ধরবে জালে
         লক্ষ কোটি তারা।"

জ্যোৎস্নারাতে সেই ছোট্ট ভাঙা টিনের ঘরে যেন সত্যিই ধরা দেয় লক্ষ কোটি তারার আলো। সেই আলোয় যখন পুরনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে আনমনে বসেন মানদা, তখন মনে হয় যেন সত্যিই সেই রূপকথার চাঁদের বুড়ি ধরা দিয়েছেন মর্ত্যে। তাঁর হাতেও সেই চরকা— কিন্তু গল্পের নয়, বাস্তবের।

নদিয়ার ফুলিয়ার শতবর্ষী মানদা বসাকের জীবনটা সত্যিই যেন রূপকথা। আজও চরকায় সুতো কাটেন তিনি। খালি চোখে। শত বছর পেরিয়ে এসেও আঙুলের ছন্দ, মনোযোগ, আর সেই নিঃশব্দ ভালবাসা— কিছুই কমেনি।

গ্রামের মানুষও তাঁকে ভালবেসে ডাকেন 'চরকাবুড়ি' নামে। নামের মধ্যেই যেন মিশে আছে এক ছবি। রাত্রি জুড়ে চরকা কাটেন এক বৃদ্ধা, আলো ছড়ান নীরবে।

দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ আর চরকার গল্প

"হেনকালে কখন আঁখি
         পড়ল ঘুমে ঢুলে,
স্বপনে তার বয়সখানা
         বেবাক গেল ভুলে।
ঘুমের পথে পথ হারিয়ে,
         মায়ের কোলে এসে
পূর্ণ চাঁদের হাসিখানি
         ছড়িয়ে দিল হেসে।"

দেশভাগের আগে মানদা দেবী ছিলেন বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। বারো বছর বয়সে বিয়ে, তারপর তিন ছেলে, তিন মেয়েকে নিয়ে গৃহস্থ জীবন। কিন্তু দেশভাগের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল সেই সুখের দিনগুলো।

স্বামী মারা গেলেন অকালেই। জীবনের ভার এসে পড়ল একা মহিলার কাঁধে। চারপাশে অনিশ্চয়তা, ভাঙা ঘর, ক্ষুধার্ত মুখ— আর একটিই ভরসা, সেই চরকা।

manada basak

মানদার হাতের চরকা তখন শুধু সুতোর আহ্লাদ নয়, সংসারেরও দড়িও বটে। ওই চক্রের ঘূর্ণনে ঘুরত সংসার, বাঁচত বাচ্চারা।

চরকার ঘূর্ণনে জীবন

"সন্ধেবেলায় আকাশ চেয়ে
         কী পড়ে তার মনে।
চাঁদকে করে ডাকাডাকি,
         চাঁদ হাসে আর শোনে।
যে - পথ দিয়ে এসেছিল
         স্বপন-সাগর-তীরে
দু-হাত তুলে সে-পথ দিয়ে
         চায় সে যেতে ফিরে।"

ছোটবেলা থেকেই সুতোর কাজে দক্ষ ছিলেন মানদা। স্বাধীনতার আগের যুগে চরকায় বসেই সংসার চালাতেন, স্বপ্ন বুনতেন।

সেই থেকে আজ তাঁর বয়স একশো পেরিয়েছে। চোখের দৃষ্টি অনেকটাই কমেছে, পা চলে লাঠির ভর দিয়ে, তবু যখন চরকা কাটতে শুরু করেন, মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে।

manada basak

ছেলেরা বলেন, “মাকে আমরা বিশ্রাম নিতে বলি, কিন্তু তিনি শোনেন না। চরকা যেন তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস।” আর মানদার মুখে এক চিলতে হাসি— “যতদিন প্রাণ আছে, চরকাই আমার সঙ্গী।”

অভাবের মধ্যেও সম্মান

"হেনকালে মায়ের মুখে
          যেমনি আঁখি তোলে
চাঁদে ফেরার পথখানি যে
         তক্‌খনি সে ভোলে।
কেউ জানে না কোথায় বাসা,
         এল কী পথ বেয়ে,
কেউ জানে না, এই মেয়ে সেই
         আদ্যিকালের মেয়ে।"

স্বাধীনতার পরেও কেটেছে চরম দারিদ্র্যের দিন। কখনও টিনের ছাদ চুঁইয়ে জল পড়েছে, কখনও আধার কার্ডের সমস্যায় থমকে গেছে সরকারি সাহায্য। অসংখ্যবার কর্তৃপক্ষ এলেও সরকারি ঘর আজও পাননি। কিন্তু তাঁর আক্ষেপে নেই হতাশার ছোঁয়া।

manada basak

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিশু ও নারী বিকাশ সমাজকল্যাণ দফতরের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মান জানানো হয়েছে। ‘নারী সম্মান’-এর সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে শতবর্ষী মানোদা যখন সার্টিফিকেট হাতে নিলেন, হাসলেন চুপচাপ— যেন বললেন, “এই সম্মান শুধু আমার নয়, সেই চরকারও।”

চরকায় বোনা ইতিহাস

মানদা বসাক শুধু এক বৃদ্ধা নন, তিনি এক ইতিহাসের সাক্ষী। স্বাধীনতার আগে থেকে আজ পর্যন্ত চরকার শব্দে জেগে থাকা এক নারী। যে চরকা একদিন মহাত্মা গান্ধীর হাতে প্রতিবাদের প্রতীক ছিল, সেই চরকাই মানদার হাতে বেঁচে আছে শ্রমের, মর্যাদার, এবং আত্মসম্মানের প্রতীক হয়ে।

manada basak

রসপুর, ফুলিয়া, ময়মনসিংহ— এই তিনটি নাম এখন একসূত্রে বাঁধা মানদার হাতে। রাত্রে যখন ভাঙা টিনের ঘরে চাঁদের আলো পড়ে, দূর থেকে শোনা যায় চরকার নরম শব্দ, সেই শব্দে মিশে যায় একশো বছরের ইতিহাস, এক নারীর দৃঢ়তা, আর সেই পুরনো রূপকথার সুর— 

"বয়সখানার খ্যাতি তবু
         রইল জগৎ জুড়ি —
পাড়ার লোকে যে দেখে সেই
         ডাকে, 'বুড়ি বুড়ি '।
সব চেয়ে যে পুরানো সে,
         কোন্‌ মন্ত্রের বলে
সব চেয়ে আজ নতুন হয়ে
         নামল ধরাতলে।"


```