Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: ‘কাছের অনেককে বলেছিলাম, বৈভবকে প্রথম বলে আউট করব!’ কথা দিয়ে কথা রাখলেন প্রফুল্লI PAC-Vinesh Chandel: ভোর পর্যন্ত আদালতে শুনানি, ১০ দিনের ইডি হেফাজতে আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ'নিষিদ্ধ' ভারতীয় গানে প্রয়াত আশা ভোঁসলেকে শেষ শ্রদ্ধা! পাক চ্যানেলকে শোকজ, সমালোচনা দেশের ভিতরেই হরমুজ মার্কিন নৌ অবরোধে কোণঠাসা ইরান! তেল রফতানি প্রায় থমকে, দিনে ক্ষতি ৪৩৫ মিলিয়ন ডলারIPL 2026: আইপিএল অভিষেকে সেরা বোলিং পারফরম্যান্স! কে এই সাকিব হুসেন? ৪৯ লাখের টিকিট থাকা সত্ত্বেও বোর্ডিং বাতিল! বিমান সংস্থার সিইও-র বিরুদ্ধে FIR-এর নির্দেশ আদালতেরশ্রমিকদের বিক্ষোভে অশান্ত নয়ডা! পাক-যোগে ষড়যন্ত্র? তদন্তে পুলিশ, ধৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৩০০ নিজেকে ‘যিশু’ সাজিয়ে পোস্ট! তীব্র বিতর্কের মুখে ছবি মুছলেন ট্রাম্প, সাফাই দিয়ে কী বললেন?IPL 2026: পয়লা ওভারেই ৩ উইকেট, স্বপ্নের আইপিএল অভিষেক! কে এই প্রফুল্ল হিঙ্গে?ইরান-মার্কিন বৈঠক ব্যর্থ নেতানিয়াহুর ফোনে! ট্রাম্পের প্রতিনিধিকে কী এমন বলেছিলেন, খোলসা করলেন নিজেই

জল যেন ছিল অভিশাপ, এখন কল খুললেই আশীর্বাদ মেলে ৭৮ বছর ধরে 'বিষ' পান করা বাংলার এই গ্রামে

বীরভূমের সিউরির কাছে মহম্মদবাজার ব্লকের ছোট্ট গ্রাম রসপুর। প্রায় তিনশোটি বাড়ি, দু'হাজারের কিছু বেশি মানুষের বসতি। 

জল যেন ছিল অভিশাপ, এখন কল খুললেই আশীর্বাদ মেলে ৭৮ বছর ধরে 'বিষ' পান করা বাংলার এই গ্রামে

ওঁরাও সম্প্রদায়ের এই মানুষগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাটিয়েছেন বিষাক্ত জলে।

শুভম সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: 28 October 2025 16:14

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা নীল রঙের কল খুলতেই স্বচ্ছ জলের ধারা (Drinking Water)। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বারো বছরের উমা সাহা প্লাস্টিকের বোতলে সেই জলই ভরছে। আশপাশে ছোটরাও সবাই স্কুলে যাওয়ার আগে একই কাজ করছে। একসময় যাদের বাড়িতে জল মানেই লালচে দাগ, ধাতব স্বাদ আর পেটের ব্যথা— আজ তারা গর্ব করে বলছে, “আমাদের গ্রামে এখন নিজস্ব পানীয়জল আছে।”

বীরভূমের (Birbhum News) সিউরির কাছে মহম্মদবাজার ব্লকের ছোট্ট গ্রাম রসপুর (Raspur)। প্রায় তিনশোটি বাড়ি, দু'হাজারের কিছু বেশি মানুষের বসতি (West Bengal News)। ওঁরাও সম্প্রদায়ের এই মানুষগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাটিয়েছেন বিষাক্ত জলে। গ্রামের আটটি টিউবওয়েলেই মিশে ছিল আয়রন, আর্সেনিক, আর নানা ক্ষতিকর ধাতু।

এপ্রিলে (২০২৫) পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। চালু হয় এক নতুন আল্ট্রাফিলট্রেশন জলশোধন প্রকল্প— যার কল্যাণে রসপুরের মানুষ আজ প্রথমবারের মতো নিরাপদ পানীয়জল পাচ্ছেন।

চম্পা সাহা, গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা। তাঁর কথায়, “বছরের পর বছর টিউবওয়েলের জল খেয়ে পেটের ব্যথা, চামড়ার রোগ, নানা অসুখ হয়েছে। বাজারের জল কিনে খাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। তাই সেই বিষাক্ত জলই খেতে হত, বাধ্য হয়ে। এখন আর সেই কষ্ট নেই।”

গ্রামের ৫০০ বর্গফুট জমির উপর তৈরি হয়েছে এই জল পরিশোধন কেন্দ্র। গভীর নলকূপ থেকে তোলা ভূগর্ভস্থ জল প্রথমে বালি ও কয়লার স্তরে ছেঁকে, পরে মেমব্রেন ও অতিবেগুনি (UV) রশ্মিতে পরিশোধিত হয়। এক হাজার লিটারের ট্যাঙ্কে সেই জল জমে, আর সেখান থেকেই একটি কমিউনিটি ট্যাপের মাধ্যমে গ্রামবাসীরা বোতল, কলসি বা ক্যান ভরছেন দিনে দু’বার করে।

স্বাধীনতার পর প্রায় আট দশক ধরে রসপুরে নিরাপদ জলের দেখা মেলেনি। একসময় গ্রামের কুয়োগুলো শুকিয়ে যায়, তার জায়গা নেয় টিউবওয়েল, কিন্তু সেগুলিও পরে বিষাক্ত জলে ভরে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দা রেখার কথায়, “আমরা জানতাম এই জল ভাল নয়। তবুও বিকল্প ছিল না। প্রতিদিন অনেকটা পথ হেঁটে জল আনতাম। এখন আর সেই ঝামেলা নেই।”

রেখার বাড়ির পাশেই আজ দাঁড়িয়ে আছে সেই আধুনিক পরিশোধন কেন্দ্র। তিনি বলেন, “এটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। এই জল শুধু পান করার জন্যই ব্যবহার হয়। আমরা নিজেরাই এর পাহারা দিই, যাতে অপচয় না হয়।”

রসপুরে এই পরিবর্তনের হাওয়া লাগে কলকাতা-ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘মেঘদূত ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে। প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জয়দীপ মুখোপাধ্যায় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি গাংটে গ্রামের একটি প্রকল্প দেখতে গিয়ে জানতে পারেন, দেউচা পাঁচামি এলাকার জলসংকট চরমে।

বীরভূমের তৎকালীন পুলিশ সুপার নগেন্দ্র ত্রিপাঠীর পরামর্শে জয়দীপ রসপুরে যান। গিয়ে গ্রামবাসীদের অবস্থা দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কারণ যে জল তাঁরা খাচ্ছিলেন, সেটা আসলে বিষ।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার ইটাল্যাবের পাঠানো জলের পরীক্ষার রিপোর্ট আসে— যেখানে প্রতি লিটারে টিডিএস ১,৩৫৫ মিলিগ্রাম এবং লিড ৪.৭০ মিলিগ্রাম, যা বিশ্বমানের তুলনায় শতগুণ বেশি।

সব দিক ভেবে জয়দীপ সিদ্ধান্ত নেন আন্তর্জাতিক মানের এক আল্ট্রাফিলট্রেশন ইউনিট বসানোর। ব্যয় পড়ে প্রায় ৮ লক্ষ টাকা, যা সম্পূর্ণভাবে ফাউন্ডেশন বহন করে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়। তারপর সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামের হাতে তুলে দেয় জয়দীপের সংস্থা। কিন্তু জয়দীপের কথায়, “ইনস্টলেশনের পরে আসল কাজ শুরু হয়— সেটা হল রক্ষণাবেক্ষণ।”

গ্রামের মহিলাদেরই দেওয়া হয় ব্যবস্থাপনার ভার। সাত সদস্যের এক কমিটি তৈরি হয়েছে, যারা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় জল বিতরণের সময় ছোট ছোট অর্থ সংগ্রহ করেন— কেউ ১ টাকা, কেউ ৫ বা ১০। এই অর্থে মেটানো হয় বিদ্যুৎ, পরিষ্কার এবং যন্ত্রাংশের খরচ। কমিটির সদস্য রেখা সাহা বলেন, “আমরা সবাই বুঝে গেছি, এই প্ল্যান্ট বন্ধ হতে দেওয়া চলবে না। এটা এখন আমাদের প্রাণ।”

আজ এই প্ল্যান্ট শুধু রসপুরের নয়, আশপাশের প্রায় হাজার জনকেও নিরাপদ জল দিচ্ছে। চম্পা সাহা নামে এক বাসিন্দার কথায়, “আগে আমরা অন্য গ্রামে যেতাম জল আনতে, এখন তারা আসে আমাদের গ্রামে।”

গ্রামের আকাশে আজ ভেসে আসে অন্য সুর। স্কুলছাত্রছাত্রীরা এখন কলসি নয়, বোতল নিয়ে যায় ক্লাসে। মেয়েরা জল আনার ফাঁকে গল্প করে, হাসে। জয়দীপ এখন যখনই রাসপুরে আসেন, দেখেন গ্রামবাসীর মুখে হাসি।

মেঘদূতম ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যেই পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় আরও চারটি নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছে। একইভাবে, স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করেই তৈরি হবে সেই মডেল।

রসপুরে এখন কল খুললেই যে স্বচ্ছ জলের ধারা বয়ে যায়, তা শুধু তৃষ্ণা মেটায় না। ৭৮ বছরের অপেক্ষার শেষে এক দীর্ঘ ইতিহাসের পিপাসাও মিটিয়ে দিচ্ছে স্বচ্ছ জলের ধারা।


```