কৃষ্ণনগর বিখ্য়াত মাটির জিনিসের জন্য। চাহিদা মতো প্রদীপের জোগান দিতে নাওয়া খাওয়া ভুলেছেন শিল্পীরা। কুমোরপাড়ায় ঢুকলেই দেখা যাচ্ছে মাটির উঠোনে সারি সারি শুকোচ্ছে প্রদীপ। শিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি এই প্রদীপই অমাবস্যায় আলোকিত করবে অগণিত ঘর।

শেষ আপডেট: 14 October 2025 18:47
কাজল বসাক, নদিয়াঃ সপ্তাহখানেক এখনও হাতে। তবে অমাবস্যার অন্ধকারে আলো জ্বালানোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। বাহারি টুনি লাইটের আলো যতই নজর কারুক, সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছে মাটির প্রদীপ। কৃষ্ণনগর বিখ্য়াত মাটির জিনিসের জন্য। চাহিদা মতো প্রদীপের জোগান দিতে নাওয়া খাওয়া ভুলেছেন শিল্পীরা। কুমোরপাড়ায় ঢুকলেই দেখা যাচ্ছে মাটির উঠোনে সারি সারি শুকোচ্ছে প্রদীপ। শিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি এই প্রদীপই অমাবস্যায় আলোকিত করবে অগণিত ঘর।
“যতই আধুনিক বৈদ্যুতিক আলো আসুক, মাটির প্রদীপের মতো শান্ত, ঐতিহ্যবাহী আলো কি আর আছে!” বলছিলেন নদিয়ার এক মৃৎশিল্পী দেবিকা পাল। হাতের কাজ থামাননি এক মুহূর্তের জন্যও। আঙুলের স্পর্শে মাটির প্রদীপে ফুটে উঠছিল সূক্ষ্ম কারুকার্য। বললেন “আমাদের এই কাজ জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে প্রদীপ বানিয়েছি। এখন নিজের ছেলেমেয়েরাও সাহায্য করে।” হেসে বললেন তিনি। জানালেন, মানুষের রুচি অনুযায়ী নানারকমের প্রদীপ তৈরি করেন। এবারও তৈরি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ রকমের প্রদীপ। তবে সব থেকে সাড়া ফেলেছে ঝাড়বাতি প্রদীপ। দেবিকা বলেন, উপর থেকে ঝুলবে সুন্দর এই কাঠামো। ভিতরে ছোট্ট প্রদীপ ছড়িয়ে দেবে মায়াবী আলো।
সামনে কালীপুজো। কুমোরপাড়ার ব্যস্ততা তাই বহুগুণ বেড়েছে। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত শিল্পীরা ব্যস্ত মাটি মেশানো, রঙ করা, পোড়ানো আর সাজানোর কাজে। আরেক অভিজ্ঞ শিল্পী সাবিত্রী পাল বললেন, “মানুষ এখন একটু অভিনব কিছু খোঁজে। তাই আমরা ডিজাইনে নতুনত্ব আনছি। মাটির প্রদীপের মায়া তো কেউ ভুলতে পারে না।”
শুধু স্থানীয় বাজার নয়, নদিয়ার এই মাটির প্রদীপ এখন কলকাতা, হুগলি, এমনকি বাংলাদেশের কিছু অংশেও পাড়ি দিচ্ছে। ব্যবসায়ী সুদীপ পাল জানালেন, “চাহিদা এতটাই বেশি যে এখনই চিন্তা হচ্ছে—সব অর্ডার সময়মতো দিতে পারব কিনা! পুজোর আগে থেকেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। এখন দিনে প্রায় কয়েক হাজার প্রদীপ তৈরি হচ্ছে।” তবে একসময় এই ছবিটা ছিল একেবারে উল্টো। বৈদ্যুতিক আলোর দাপটে মাটির প্রদীপের ব্যবসা প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক শিল্পী তখন পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই আবার ফিরে এসেছে সেই পুরনো দিন। কারণ, উৎসব মানে শুধু আলো নয়—তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্য, অনুভব।
নদিয়ার এই কুমোরপাড়াগুলো শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়, বরং ঐতিহ্যের রক্ষক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এরা টিকিয়ে রেখেছেন প্রাচীন দীপাবলির আবহ। কালীপুজোর রাতে যখন কলকাতা থেকে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত আলোর স্রোত বয়ে যাবে, তার মধ্যে সবচেয়ে নরম, অথচ সবচেয়ে মায়াবী আলোটা হবে কিন্তু এখানে তৈরি সেই মাটির প্রদীপের।