
শেষ আপডেট: 3 January 2024 14:21
নদীর বুকে সকলের অজান্তেই গড়ে উঠেছিল মাটির ঢিপি। জোয়ারের জল বাড়লেও সেই উঁচু ঢিবির উপর কখনও নাকি জল উঠত না। আশেপাশের এলাকা জলমগ্ন হলেও ঢিবি থাকত অক্ষত। কবে থেকে যেন নদীপথে বিপদে পড়লে সেখানে মাথা ঠুকতেন মানুষ। হিন্দু হলে স্মরণ করতেন ঈশ্বরকে। মুসলমান হলে ডাকতেন আল্লাহকে। এভাবেই জন্ম হল দেবতার। গড়ে উঠল মন্দির। মানুষের মুখে মুখে গ্রামের নামকরণ হয় নারায়ণীতলা। প্রাচীন মন্দিরে শুরু হয় পুজোপার্বণ। সারাবছর পুজো হলেও, মকর সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে মাঘ মাসের প্রথম তিন দিন মেলা বসে মন্দির সংলগ্ন এলাকায়। সেই প্রস্তুতি শুরু হয় গেছে।
সুন্দরবনের দাপুটে মাতলা নদীর শাখানদী পিয়ালি। নদীর দু’ধারে সারি সারি হেতাল, গরানের জঙ্গল। সেখানেই তিলপী ও ধর্মতলার কচুয়া এলাকা। আগে এখানে কোনও মানুষের বসবাস ছিল না। ব্যবসার জন্য তখন এলাকার মানুষজন পালতোলা নৌকায় চেপে পিয়ালির বুক চিরে ধোষা বাজারে যেতেন। ধোষা বাজারের কয়েক কিলোমিটার আগেই একটি জায়গায় প্রায় নাকি নৌকাডুবি হত। অসংখ্য মানুষজনের সলিল সমাধি হয়েছে সেখানে। পিয়ালির যেখানে অহরহ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটতে সেখানেই আচমকা তৈরি হয় মাটির উঁচুঢিবি। আশ্চর্য্যজনক সেই জায়গায় বিপদ থেকে বাঁচতে ভগবান ও আল্লাহর স্মরণ করতেন যাত্রীরা। ধীরে ধীরে সেই উঁচু ঢিবির উপর গড়ে ওঠে একটি মন্দির। পুজো শুরু হয় বনবিবি, নারায়ণী ও গঙ্গার।
পিয়ালি নদীকে বাগে আনতে ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। কেল্লা এলাকায় সেই বাঁধ নির্মাণ হয়। তারপরেই দাপট হারিয়ে মজে যেতে থাকে পিয়ালি। ১৯৯০ সাল নাগাদ আমতলার কচুয়া সংলগ্ন পিয়ালির তীরে গড়ে ওঠে জনবসতি। নারায়ণী দেবীর নাম অনুসারে গ্রামের নাম হয় নারায়ণীতলা। প্রাচীন মন্দিরে শুরু হয় ঘটা করে পুজোপার্বণ। মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে মাঘ মাসের প্রথম তিন দিন মেলা বসত। সেই মেলার জাঁকজমক এখন আরও বেড়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রাচীন এই মন্দিরটির ভগ্নদশায় মনখারাপ এলাকাবাসীর।
এলাকার যুবক রথীন মিস্ত্রি বলেন, “ঠাকুরদার কাছে গল্প শুনেছিলাম কোন এক মুসলিম ব্যক্তি মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন। তাঁর নামে একটি মামলা চলছিল। দেবীর থানে মানত করেছিলেন, মামলায় জিতলে মন্দির তৈরি করে দেবেন। মামলায় জয়ী হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন তিনি। তবে তাঁর নাম জানা যায় না।”
এলাকার বাসিন্দা ইয়াহিয়া আখন্দ জানিয়েছেন, “বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে শুনে আসছি একসময় বক্তিয়ার খিলজির হাত থেকে প্রাণ বাঁচার জন্য লক্ষণ সেন এখানে আত্মগোপন করেছিলেন। তবে মন্দিরের এখন ভগ্নদশা। সংস্কার খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।” এলাকার বাসিন্দা বছর ৮৩- র বৃদ্ধ শচীপদ গায়েন জানিয়েছেন, মন্দিরটি সংস্কারের কাজে হাত লাগিয়েছেন গ্রামের মানুষ। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের জেরে তা থমকে রয়েছে।