মীরজাফরের ১৬তম বংশধর তথা মুর্শিদাবাদ পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর ফাহিম আলি মির্জা বলেন, “আমার বাবা একসময় রাজ্য সরকারের অধীনে নবাবি এস্টেটে চাকরি করতেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবা ও আমার নাম ছিল, আমরা ভোটও দিয়েছিলাম। এখন কেন আমাদের নাম বাদ গেল সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই।”

শেষ আপডেট: 30 March 2026 16:22
মামিনুল ইসলাম, মুর্শিদাবাদ: যে নবাব পরিবারের দরবারে ৩০০ বছর আগে বাংলা-বিহার-ওড়িশার লক্ষ লক্ষ প্রজা প্রতি বছর নজরানা দিতে আসত, সেই মীরজাফরের বংশধররাই এখন নিজেদের ‘ভারতের নাগরিক’ হিসেবে প্রমাণ করতে লড়াই করছেন।
বিধানসভা ভোটের (West Election 2026) মুখে মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের প্রায় শতাধিক সদস্যের নাম ভোটার তালিকা (Voter List) থেকে ডিলিট করে দেওয়ার অভিযোগ উঠল। আদৌ আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে এখন সন্দিহান নবাব পরিবারের এই সদস্যরা। নিয়ম মেনে এখন তাঁরা ট্রাইব্যুনালে যাচ্ছেন। শুনানির নোটিস (SIR Hearing) পেয়ে নবাব বংশের সদস্যরা সব নথি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সামনে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু শুনানির পরেও পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের নাম স্থায়ীভাবে তালিকা থেকে 'ডিলিট' করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ব্রিটিশের সহায়তায় মসনদে বসেন মীরজাফর। তাঁর ১৫ তম বংশধর মহম্মদ রেজা আলি মির্জা, এখনও মুর্শিদাবাদের ‘ছোটে নবাব’ নামে পরিচিত। এখনও 'কিল্লা নিজামত' এলাকার ঘণ্টা ঘরের কাছে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন তিনি । ১৬তম বংশধর সৈয়দ মহম্মদ ফাহিম মির্জাও বাবার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন। 'কিল্লা নিজামত' চত্বরে নবাব পরিবারের আরও বহু সদস্যর বাস। তাঁদের অনেকের নামই ভোটার তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে মুছে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
মীরজাফরের ১৬তম বংশধর তথা মুর্শিদাবাদ পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর ফাহিম আলি মির্জা বলেন, “আমার বাবা একসময় রাজ্য সরকারের অধীনে নবাবি এস্টেটে চাকরি করতেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবা ও আমার নাম ছিল, আমরা ভোটও দিয়েছিলাম। এখন কেন আমাদের নাম বাদ গেল সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই।”
জানা গেছে, লালবাগের নব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২১ নম্বর বুথে যেখানে নবাব পরিবারের সদস্যরা ভোট দেন, সেখানে প্রায় ৮৫০ জনের মধ্যে ২৮৬ জনের নাম বাদ পড়েছে, যাঁদের বেশিরভাগই নবাব পরিবারের। বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে রয়েছেন ফাহিম, তাঁর বাবা, স্ত্রী, জ্যাঠা মহম্মদ আব্বাস আলী মির্জার দুই মেয়ে ও বড় ছেলে।
নাম বাদ পড়ায় স্পষ্টতই হতাশ ফাহিম বলেন, “মুর্শিদাবাদ শহরে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে অন্যান্য নবাবি স্থাপত্য সব আমাদের পূর্বপুরুষের তৈরি। অথচ ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম কেটে নাগরিকত্বই কেড়ে নেওয়া হল। আমার পূর্বপুরুষ, মীরজাফরের ১৩ তম বংশধর সৈয়দ ওয়াসিফ আলি মির্জাকে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের পরিবার চিরকাল ভারতীয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুর্শিদাবাদ তিনদিন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শেষে আমাদের পরিবারের হস্তক্ষেপে খুলনার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।"
তিনি মনে করিয়ে দেন, তাঁর জ্যাঠা আব্বাস আলি মির্জা নবাবি অধিকার ফিরে পেতে কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে নবাবের বংশধর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মামলা চালানোর অধিকারও দিয়েছিল বলে জানান ফাহিম । পাশাপাশি তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে যে আমরা ভারতের নাগরিক?”
শুধু তাই নয়, নাম সংশোধনের কথাও তুললেন ফাহিম। তিনি বলেন, "২০০২-এর তালিকায় বাবার নাম ছিল ‘মহম্মদ রেজা আলি মির্জা’ (সৈয়দ ছিল না), আমার নাম ছিল ‘সৈয়দ ফাহিম মির্জা’ (মহম্মদ ছিল না)। কমিশনের নিয়ম মেনে পরে দুজনের নাম সংশোধন করি। যদিও এবার এসআইআর -এ আমাদের নাম প্রথমে 'বিবেচনাধীন' ছিল। শুনানির নোটিশ পেয়ে নির্বাচন কমিশনকে সম্মান জানিয়ে অসুস্থ শরীরে আমার ৮২ বছর বয়সের বাবা নিজে লাইনে দাঁড়িয়ে সব নথি জমা দেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হল না।"
ব্যঙ্গাত্মক সুরে ফাহিম বলেন, “একসময় নবাবি দরবারে আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রজাদের বিচার করতেন। কিন্তু এখন নির্বাচন কমিশন আমাদের পরিবারের 'বিচার' করে স্থায়ীভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দিল। মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের সদস্যরা কি এখন আর ভারতের নাগরিক নন? এর জবাব দিক জাতীয় নির্বাচন কমিশন ।" তিনি জানান, নাম বাদ গেলে ট্রাইবুনালে আবেদনের পথ আছে, তাঁরা সেখানে আবেদন করবেন। কিন্তু শুনানি হতে এত সময় লাগবে যে ততদিনে বিধানসভা ভোট পেরিয়ে যাবে—পরিবারের কেউই এবছর ভোট দিতে পারবেন না।
মুর্শিদাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রের বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক তথা এবার ওই কেন্দ্রের প্রার্থী গৌরিশঙ্কর ঘোষ বলেন," আমাদের দল বা নির্বাচন কমিশন কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিতে বলেনি। যদি কারও নাম কোনও কারণে বাদ গিয়ে থাকে তারা 'ফর্ম ৬' পূরণ করে নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় তুলতে পারবেন।"