দ্য ওয়াল ব্যুরো: রেখা নাকি! মুম্বইয়ের ট্রেনে অভিনেত্রী রেখা! এমন অপরূপ সাজে, এমন মুগ্ধ ভঙ্গিমায় নাচ দেখাচ্ছেন! ভুল ভাঙে ক্ষণিকে। রেখা নয়, রেখার মতো। তবে ভুল ভাঙলেও, বিস্ময় ভাঙে না। বরং আরও বেশি করে জেঁকে বসে 'স্বাভাবিক' রেলযাত্রীদের মনে। 'অস্বভাবিক'ও যে এমন সুন্দর হয়, তা তো সচরাচর দেখা যায় না!
প্রতিদিন মুম্বই শহরে ব্যস্ততার সময় যখন ট্রেন ধরার জন্য ছোটাছুটি শুরু হয়, তখন তাঁকে দেখে মাঝপথেই থমকে যেতে পারেন যে কেউ। জারদৌসি শাড়িতে সেজে প্রতিদিন রেখা অভিনীত সিনেমার গানেই নাচতে দেখা যায় তাঁকে। সে নাচের ছন্দে, মুদ্রায় মেতে ওঠেন সকলে। গত কয়েক দিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল তাঁর নাচ, অভিনয়। তিনি মুম্বাই লোকালের সেনসেশন রেখা ওরফে পূজা শর্মা।
তিনি এতজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। হিজড়ে। নিজেকে নিজেও এই সম্বোধনেই ডাকেন তিনি। কোনও লজ্জা নেই, সঙ্কোচ নেই। নেই কোনও দ্বিধা। ট্রেনের কামরায় এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের 'উৎপাত' নিয়ে নানা সময়ে কত অভিযোগই না করেন কত মানুষ। অথচ সেই একই ভূমিকায় পূজা যেন এক ঝলমলে উপাখ্যান। কেউ বিরক্ত তো হনই না, বরং তাঁর নাচ দেখার জন্যই ট্রেনে চাপেন অনেকে। তাঁকে সকলে ভালবাসেন, সম্মানও করেন।
সকাল থেকে রাত অবধি মহিলা কামরাতেই দেখা যায় পূজাকে। ভিড়ের তবে যে সে সাধারণ পোশাকে নয়। প্রতিদিন জারদৌসি বা সিল্ক বা কাঞ্জিভরম শাড়ি পরে ট্রেনে ওঠেন। তাঁর সাজ দেখলে চমকে যাবেন যে কেউ। মাথায় গাজরা। গা ভর্তি গয়না। সাজের থেকেও বেশি অবাক হবেন তাঁর মেকআপ দেখলে। রেখার সিগনেচার স্টাইল কীভাবে নকল করলেন তিনি! সেই সিঁদুর, মাঝ কপালে বড় টিপ। ঠোঁটে লালচে খয়েরি লিপস্টিক। চোখের নীচে কাজল। হুবহু!
আর এসব কিছু নিয়ে, ভিড় ঠাসা চলন্ত ট্রেনে দিব্যি নাচছেন তিনি। উপচে পড়ছে লাস্য। কখনও পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলে জড়িয়ে ধরছেন, কখনও বা ছোট বাচ্চাকে আদর করে কোলে তুলে নিচ্ছেন। তার পরে ফের মাতছেন নাচে। এক ফুট জায়গাতেও যে রেখার মতো করে এমন নাচা যায়, তা তাঁকে না দেখলে কে জানত!
https://twitter.com/RajmoniBorah3/status/1329737066297475075
প্রতিদিন যে হুবহু রেখার সাজ এভাবে নকল করা সহজ নয়, পূজা নিজেই জানিয়েছেন। তবু দিনের পর দিন 'দিল চিজ কেয়া হে' থেকে 'সালামে ইশক মেরি জান'-- রেখার সব নাচেই মুগ্ধতা ছড়ান লোকাল ট্রেনে। বদলে প্রণাম করে শুধুমাত্র এক টাকা চান। মাত্র এক টাকাই। না, কোনও জোর করেন না সেই একটা টাকার জন্যও। পূজা জানিয়েছেন তাঁকে নিজে থেকেই প্রত্যেকে কিছু না কিছু দেন। তাতেই চলে ওর পেট। এমনকি এত দামী শাড়ি, গয়না সব ওই টাকাতেই কেনেন।
এক ইন্টারভিউয়ে পূজা জানিয়েছেন, ছোটবেলায় খুবই এগিয়ে থাকতেন তিনি সবেতে। পড়াশোনায় ভাল ছিলেন, কেলাধুলোতেও। তবে যেদিন থেকেই বুঝতে পারেন তিনি 'আলাদা', সেদিন থেকেই কাছের মানুষদের থেকে অবহেলা পাওয়া শুরু হয়। এমনকি একবার যৌনহিংসারও শিকার হন তিনি।
কিন্তু এসব অন্ধকার পার করে মুম্বই আসার পরেই জীবন বদলে যায় তাঁর। পূজা বলেছেন, যাঁরা ছোট থেকে নায়ক-নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তাঁরা সকলে মুম্বাইতে আসেন। পূজাও তেমন ভেবেই এসেছিলেন। না, নায়িকা হওয়া হয়নি। তবে মুম্বই আসার পরে, লোকাল ট্রেনের সাধারণ মানুষের ভালবাসা তাঁকে জীবনের কালো মুহূর্তগুলোকে ভুলিয়ে দিয়েছে।
পূজাকে দেখলে কেউ বিরক্তি প্রকাশ করেন না। কেউ সরে যান না। বরং 'রেখা এসেছে' বলে ছুটে আসেন লোকাল ট্রেনের প্যাসেঞ্জাররা। সকলে ভালবাসেন তাঁকে, গল্প করেন অনেক। সারাদিন তাঁদের সঙ্গে গল্প করেন, নাচ করে যা পান, তাতেই হাসিমুখে দিন কেটে যায় পূজার। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য এই ভালবাসাটুকুরই প্রয়োজন, পূজা বলেছেন। বলেছেন তিনি এভাবেই সারাজীবন 'লোকাল ট্রেনের রেখা' হয়ে বেঁচে থাকতে চান।
পূজা মনে করেন, "হিজড়েরা পৃথিবীতে খুব ভাল আছে, ওদের কোনও অভাব নেই, অভাব শুধু ইজ্জতের। ওঁদের সম্মান নিয়ে বাঁচতে দাও, তাহলেই সব ঠিক থাকবে।"