এমনই এক বিস্ময়কর কাহিনীর সাক্ষী নদিয়ার শান্তিপুরের রায় বাড়ি, যেখানে দেবী দুর্গা পূজিতা হন ‘কুলোদেবী’ হিসেবে।

শেষ আপডেট: 9 September 2025 17:34
কাজল বসাক, নদিয়া: দুর্গাপুজোর ইতিহাস মানেই কেবল বারোয়ারি বা জমিদারবাড়ির আড়ম্বর নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে মিশে থাকে অপূর্ব সব কাহিনি, লোকবিশ্বাস আর প্রজন্মান্তরের উত্তরাধিকার। এমনই এক বিস্ময়কর কাহিনীর সাক্ষী নদিয়ার শান্তিপুরের রায় বাড়ি, যেখানে দেবী দুর্গা পূজিতা হন ‘কুলোদেবী’ হিসেবে।
কথিত আছে, প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই রায় পরিবারের গৃহকর্তা গৌর হরি ঠাকুর (Gour Hari Thakur) প্রতিদিনের মতো পুজা করছিলেন। সেই সময় এক অচেনা তৃষ্ণার্ত নারী তাঁর গৃহিনীর কাছে এসে জল চান। গৃহকর্ত্রী গঙ্গাজল আর সঙ্গে একটি নাড়ু দেন মহিলাকে। সেই জল খেয়েই বাড়ির আঙিনা থেকে বেরিয়ে যান ওই নারী। বলে যান বাইরে তাঁর সন্তানরা অপেক্ষায় আছেন। ভরদুপুরে অন্ন মুখে না তুলে এক নারী ও তাঁর সন্তানরা বেরিয়ে যাবে! সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ছোটদের গৃহকর্ত্রী আদেশ দেন, বাইরে থেকে তাঁদের ডেকে আনতে। কিন্তু দরজার বাইরে গিয়ে আর কাউকে খুঁজে পাননি তাঁরা। সেই রাতেই তিনি স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে দেবী নির্দেশ দেন, তাঁর আরাধনা শুরু করতে হবে। কিন্তু সেই সময়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। তাই ধুমধাম করে প্রতিমা গড়ার সামর্থ্য ছিল না রায় পরিবারের। উপায় না দেখে একটি কুলোর ওপর দেবীর ছবি আঁকিয়ে পুজো শুরু করেন গৌর হরি। সেই থেকেই দেবীর নাম হয় ‘কুলো দেবী’।
ইতিহাস বলছে, রায় পরিবার মূলত চুঁচুড়ার বাসিন্দা ছিলেন। মুঘল অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা শান্তিপুরে আশ্রয় নেন। দেবীর কৃপায় এখানে এসে ক্রমে প্রভাবশালী জমিদার হয়ে ওঠেন গৌরচাঁদ রায়। আর্থিক অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই দেবীর পূজাও ধীরে ধীরে বড় আকার নেয়। কিন্তু নাম রয়ে যায় ‘কুলো দেবী’ই। এই পুজোর বিশেষত্ব হল, এখানে দেবী একাই পূজিতা হন। সাধারণত দুর্গাপুজোয় দেবীদুর্গার সঙ্গে থাকেন গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী। কিন্তু শান্তিপুরের রায়বাড়িতে দেবীর সঙ্গে থাকেন না তাঁর সন্তানরা। পরিবারের সদস্য উজ্জ্বল রায় বলেন, "আসলে এ বাড়িতে মা তো প্রথম একাই এসেছিলেন, তাই তাঁকে সেই একাকীই পুজো করা হয়। এখানে দেবীর সঙ্গে থাকেন না কার্তিক-গণেশ-লক্ষ্মী-সরস্বতী।
আচার-অনুষ্ঠানও এই বাড়িতে একেবারে অনন্য। পুজোর আগের দিন ভাজা হয় ‘আনন্দ নাড়ু’, যা স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবমীতে মায়ের প্রসাদ হিসেবে রান্না হয় মাছ। বলির প্রথা থাকলেও এখানে পশুবলি দেওয়া হয় না। পরিবর্তে কুমড়ো ও আখ বলি দেওয়া হয়।লোকবিশ্বাস, আঞ্চলিক ঐতিহ্য আর শতাব্দীপ্রাচীন স্মৃতির মিশেলে রায় পরিবারের কুলোদেবীর পুজো আজও পূর্ণ ভক্তি ও শ্রদ্ধায় উদযাপিত হয়। প্রতি বছর দুর্গোৎসবের কোলাহলের মাঝেও শান্তিপুরের কুলো দেবীর পুজো এক অন্য মাত্রা যোগ করে। যেখানে প্রতিমার চাকচিক্য নয়, বরং অটল ভক্তি আর ঐতিহ্যের আলোয় আলোকিত হয় মায়ের আরাধনা।