চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক একাধিক সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপকে ‘গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কড়া চিঠি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের
শেষ আপডেট: 10 January 2026 17:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) ভূমিকা ক্রমশ রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠছে। এই অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে (Gyanesh Kumar) চিঠি লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক একাধিক সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপকে ‘গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ছাপা চিঠির শেষে হাতে লিখে মুখ্যমন্ত্রী এও লিখেছেন, "জানি আপনি কোনও উত্তর দেবেন না, কিন্তু সমস্ত তথ্য আপনার কাছে তুলে ধরা আমার কর্তব্য।"
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজ্যের বাইরে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের বাস্তব সমস্যার কথা বারবার জানানো সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন দেরিতে এবং আংশিক ছাড় দিয়েছে। পরিবারের অনুমোদিত সদস্যের মাধ্যমে শুনানিতে হাজির হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও সেই সুবিধা সব পরিযায়ী শ্রমিক পাচ্ছেন না। এতে মাটির বাস্তবতা সম্পর্কে কমিশনের সংবেদনশীলতার অভাবই প্রতিফলিত হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ।
মমতার দাবি, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক আচরণে রাজনৈতিক পক্ষপাত ও স্বেচ্ছাচারিতার ছাপ স্পষ্ট। ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য যেখানে সংশোধন ও অন্তর্ভুক্তি হওয়া উচিত, সেখানে তা ক্রমশ বাদ দেওয়া এবং বঞ্চনার দিকে যাচ্ছে। এই প্রবণতা নজিরবিহীন এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূলেই আঘাত করছে বলে মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, রাজ্যে নিযুক্ত পর্যবেক্ষক ও মাইক্রো-অবজার্ভারদের অনেকেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা ছাড়াই কাজ করছেন। কেউ কেউ তাঁদের দায়িত্বের সীমা ছাড়িয়ে সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে অসভ্য আচরণ করছেন বলেও অভিযোগ। এমনকি কিছু পর্যবেক্ষকের বিরুদ্ধে মানুষকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে গঙ্গাসাগর মেলার মতো বড় কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকা রাজ্য পুলিশকে তথাকথিত পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে বলা হচ্ছে, যা অনুচিত বলেই মনে করছে নবান্ন।
মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা তথ্যগত অসঙ্গতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, এই গরমিল আসলে যুক্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বেছে বেছে কিছু এলাকায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য ব্যবহৃত পোর্টাল অন্য রাজ্যের থেকে আলাদা বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি, পিছনের দিক থেকে নিষ্পত্তির নিয়ম বদলে দেওয়ায় প্রশাসনিক স্তরে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। মমতার মতে, এই প্রক্রিয়া রাজ্যের যোগ্য ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার গোপন চেষ্টারই নামান্তর।
চিঠিতে উদাহরণ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, নামের বানান বা বয়সে সামান্য তারতম্যের মতো তুচ্ছ কারণে নাগরিকদের তলব করা হচ্ছে। কোথাও ‘মমতা’ ও ‘মামতা’, আবার ‘কুমার’ বদলে ‘কোমার’ বা ‘কুমের’— এমন সামান্য ভুলকে কেন্দ্র করে মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। বয়সের ক্ষেত্রে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে ১৮-১৯ বছরের ফারাককেও সমস্যা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এই ধরনের তুচ্ছ কারণে মানুষকে শুনানিতে ডেকে এনে সময়, অর্থ ও দৈনন্দিন রোজগারের ক্ষতি করা হচ্ছে— এর দায় কে নেবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
চিঠির শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, তিনি আশাবাদী, এখনও সময় থাকতেই নির্বাচন কমিশন সদ্বুদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের হয়রানি কমাতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী পদক্ষেপ করবে। যদিও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এই বিষয়ে কমিশনের তরফে কোনও জবাব বা ব্যাখ্যা না এলেও রাজ্যের মানুষের স্বার্থে তথ্য তুলে ধরা তাঁর কর্তব্য ছিল।