
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও মিতালী বাগ।
শেষ আপডেট: 12 May 2024 09:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কালীঘাট থেকে দাতপুর দেখা যায়? এমন কোনও দূরবীন আছে কি?
হাজিপুর বাস স্টপ থেকে বাঁদিকে সরু রাস্তা নেমে গেছে। শীতলা মন্দিরকে ডান হাতে রেখে একটু এগোলে দাতপুর গ্রাম। মিতালী নামটাই এখন যথেষ্ট। পদবীও বলতে হয় না। গাড়ির কাচ নামিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই ডান দিক-বাম দিক করে বুঝিয়ে দেয় ঠিকানা। মাটির বাড়ি। দোতলার বারান্দা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বারান্দায় জং ধরা টিনের চাল।
সেই বাড়ির দাওয়া থেকে মধ্যবয়সী যে মহিলা নেমে এলেন, তাঁর হাঁটাচলা, কথা বলা বেশ সপ্রতিভ। পেশায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। কোনও কিছু বুঝিয়ে বলার বা গুছিয়ে বলার ক্ষমতা দিব্য রয়েছে। কথার পিঠে কথা বলেন, উত্তর দেন। তবে পোশাক, পরিচ্ছদ, পায়ের চপ্পল, বাম হাতে পরা বড় ডায়ালের কালো ঘড়ি— কোনওটাই যেন টিপিকাল রাজনীতিক সুলভ নয়। বোঝার উপায় নেই, এই মহিলাই হুগলি জেলা পরিষদের বর্তমান সদস্য বা গোঘাট (২) ব্লক মহিলা তৃণমূলের সভানেত্রী।
দাতপুর গ্রামের কোনও তফসিলি মেয়ে এই প্রথম এত বড় ভোটে প্রার্থী হলেন। গ্রামের গর্ব রয়েছে। সঙ্গে কৌতূহলও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মিতালীকে খুঁজে নিলেন কীভাবে?
আরামবাগ লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে মিতালী বাগের নাম ঘোষণার আগে পর্যন্ত জেলায় দলেরও অনেকে হয়তো তাঁকে চিনতেন না। তবে শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিলক্ষণ চিনতেন। বললেন, “ও মেয়ে তো মেয়ে নয়, দেবতা নিশ্চয়। প্রতিবাদী মেয়ে। লড়াই করে উঠে এসেছে। ও লড়ে যাবে। জিতবে”।
এবার লোকসভা ভোটে ১২ জন মহিলাকে প্রার্থী করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের মধ্যে দু’জন আবার তফসিলি জাতির মানুষ। আরামবাগে মিতালী ও বিষ্ণুপুরে সুজাতা মণ্ডল। মিতালীর মতই সুজাতাও বাঁকুড়ার জেলা পরিষদের সদস্য। আর নতুন মুখ বলতে আনা হয়েছে চিকিৎসক শর্মিলা সরকারকে। তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে পূর্ব বর্ধমানে।
মিতালী এঁদের মধ্যে অনন্য। রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছে বাকিদের অনেক আগে। বাবা মদনমোহন বাগ ছিলেন তৃণমূলের কর্মী। ২০১৬ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ করেছেন মিতালী। বিএডও করেছেন। অঙ্গনওয়াড়িতে কাজ করতে করতেই রাজনীতিতে নেমে পড়েন। তিনি অবিবাহিত।
দাতপুরের বাড়ির দাওয়ায় বসেই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, মনোনয়ন দিতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন কেন? মিতালীর চোখ যেন আবার ছল ছল করে ওঠে। বলেন, “ভাবতে পারিনি। এখনও ভাবতে পারছি না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে প্রার্থী হিসাবে বেছে নিলেন। এ কোনও দিনও কল্পনাতেও আসেনি। তৃণমূল বলেই সম্ভব হল।”
মেয়ের কান্না দেখে সেদিন মা সন্ধ্যা বাগও কেঁদেছিলেন। বললেন, “কাঁদব না! ওঁর বাবা বেঁচে থাকলে এই দিনটায় কত আনন্দই না পেত। ওঁর বাবাও হয়তো আনন্দে কেঁদে ফেলত”।
বাংলার রাজনীতিতে এখন সাধারন ধারণা হল, আরামবাগে এবারের লড়াই কঠিন। উনিশ সালের লোকসভা ভোটে এই আসনে তৃণমূলের অপরূপা পোদ্দার জিতেছিলেন মাত্র ১১৪২ ভোটে। পরে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আরামবাগ মহকুমায় চারটি আসনে জিতেছে বিজেপি। সেগুলি হল, পুরশুড়া, খানাকুল, গোঘাট এবং আরামবাগ।
আরামবাগে যে এবার তৃণমূলের প্রার্থী বদল করা হতে পারে সেই দেওয়াল লিখন পরিষ্কার ছিল। বহু আগেই সেই খবর লেখা হয়েছিল দ্য ওয়ালে। এ ব্যাপারে কোনও রহস্য বাকি ছিল না। তবে কৌতূহল ছিল, তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত এই আসনে তৃণমূল কাকে প্রার্থী করে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অমল মুখোপাধ্যায়ের কথায়, অনেক সময়েই দেখা যায় বহু এলাকায় কোনও রাজনৈতিক দলের জনভিত্তি ও সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত থাকলেও, জনপ্রতিনিধির উপর স্থানীয় স্তরে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়। তখন সেই জনপ্রতিনিধি বদল করলেই পুনরায় ভাল ফল পাওয়া যায়। আরামবাগেও সম্ভবত সেই কারণেই শাসক দলের প্রার্থী বদল হয়েছে। এমন এক মুখকে প্রার্থী করা হয়েছে, যিনি প্রকৃত অর্থে প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি, সৎ এবং রাজনীতিতে নিষ্ঠাবান।
মিতালীর কথায়, “আমার আর কী আছে? সততার সঙ্গে রাজনীতিটা করতে চাই। আরামবাগে অনগ্রসর মহিলাদের জন্য কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে।”
আরামবাগ লোকসভায় শহরাঞ্চল থাকলেও বেশিরভাগটাই গ্রামীণ এলাকা। বাবুইমারির পঞ্চানন মণ্ডল যেমন বললেন, “ওনাকে তো আগে থেকেই চিনি। ব্যক্তিগত আলাপ নেই তবে দূর থেকে। অঙ্গনওয়াড়ির দিদিমণি তো, এখানকার গাঁ গঞ্জ, পাড়া নিশ্চয়ই হাতের তালুর মতো চেনেন”।
মিতালীর পেশাদার জনসংযোগ টিম নেই। প্রচারে বেরোলে কেউ ছবি তুলে সমাজ মাধ্যমে পোস্ট করে দেবে এমন ‘ভাড়াটে সৈনিকও’ নেই। যেটুকু হচ্ছে, তা করছেন দলীয় কর্মীরাই। দেখা যাচ্ছে, প্রচারে বেরিয়ে গ্রামের কোনও বাড়ির উঠোনে মাটির উনুনে রান্নায় বসে পড়ছেন মিতালী। গেরস্তর বাড়ি থেকে কেউ স্টিলের বাটিতে একটু সবজি দিলে খেয়ে নিচ্ছেন। কখনও আলু খেতে নেমে পড়ছেন আলু তুলতে। কখনও বা প্রচারে বেরোচ্ছেন টোটোয় চড়ে। বললেন, “রাজনীতি আমার রক্তে রয়েছে। বাবাকে দেখেছি। দারিদ্র দেখেছি খুব কাছ থেকে। আরামবাগের মানুষের কী দরকার আমার চেয়ে ভাল কেউ জানে না”।
আরামবাগ আসনটি একদা বামেদের অভেদ্য দূর্গ ছিল। অভেদ্য এই কারণেই যে একটানা বিশ বছর এই আসন থেকে জিতেছিলেন সিপিএমের অনিল বসু। বাংলায় যখন পালা বদলের পরিবেশ ক্রমশ জোরদার হচ্ছে, তখন অর্থাৎ ২০০৯ সালে লোকসভা ভোটে এই আসনে অনিলকে আর প্রার্থী করেনি সিপিএম। অনিল জনপ্রিয়তা হারানোয় প্রার্থী বদল করা হয় আরামবাগে। তাছাড়া এই আসনটি তফসিলিদের জন্য সংরক্ষিতও হয়ে যায়। সেই নির্বাচনের পর থেকেই আরামবাগে বামেদের ভোট ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে। গত দুটি লোকসভা ভোটের ফলাফল দেখলেই বোঝা যাবে, বর্তমানে বিজেপির ভোট বাক্স বামেদের সেই পুরনো ভোটেই অনেকটা পুষ্ট।
তবে মিতালীর কথায়, “অত কিছু অঙ্ক কষছি না। আরামবাগ আসনে গত দশ বছর ধরে তৃণমূল রয়েছে। এবারও জিতব। দলের সংগঠন এখানে মজবুত, মানুষের আস্থা আছে, আর দিদির আশীর্বাদ আছে। আমাকে হারাবে কে?”