Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
‘কোভিড ভ্যাকসিনই হার্ট অ্যাটাকের কারণ!’ শেন ওয়ার্নের মৃত্যু নিয়ে ছেলের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক এবার রক্তদান শিবিরেও কমিশনের ‘নজরদারি’! রক্তের আকাল হলে কী হবে রোগীদের? প্রশ্ন তুললেন কুণালমারাঠি না জানলে বাতিল হবে অটো-ট্যাক্সির লাইসেন্স! ১ মে থেকে কড়া নিয়ম মহারাষ্ট্রেআশা ভোঁসলেকে শ্রদ্ধা জানাতে স্থগিত কনসার্ট, গায়িকার নামে হাসপাতাল গড়ার উদ্যোগউৎসবের ভিড়ে হারানো প্রেম, ট্রেলারেই মন কাড়ছে ‘উৎসবের রাত্রি’‘বাংলাকে না ভেঙেই গোর্খা সমস্যার সমাধান’, পাহাড় ও সমতলের মন জিততে উন্নয়নের ডালি শাহেরথাকবে না লাল কার্ড, খেলা ৫০ মিনিটের! ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করতে ছকভাঙা প্রস্তাব নাপোলি-প্রধানেরনতুন সূর্যোদয়! নীতীশের ছেড়ে যাওয়া মসনদে সম্রাট চৌধুরী, প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী পেল বিহারমাত্র ৫০০ টাকার পরীক্ষা বাঁচাবে কয়েক লাখের খরচ, কেন নিয়মিত লিভারের চেকআপ জরুরি?অভিষেক ও তাঁর স্ত্রীর গাড়িতে তল্লাশির নির্দেশ! কমিশনের ‘হোয়াটসঅ্যাপ নির্দেশ’ দেখাল তৃণমূল

কালীক্ষেত্র সোনামুখী, বর্গী হানা থেকে সোনামুখীকে বাঁচিয়েছিলেন মা-ই-ত কালী

এ বছর কালীপুজোয় একেবারে অন্যরকম মা কালীর দর্শন পেতে চান? তাহলে আপনাদের  গন্তব্যস্থল হতে পারে বাঁকুড়ার সোনামুখী।

কালীক্ষেত্র সোনামুখী, বর্গী হানা থেকে সোনামুখীকে বাঁচিয়েছিলেন মা-ই-ত কালী

'মা-ই-ত মা'

শেষ আপডেট: 29 October 2024 19:25

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় 

এ বছর কালীপুজোয় একেবারে অন্যরকম মা কালীর দর্শন পেতে চান? তাহলে আপনাদের গন্তব্যস্থল হতে পারে বাঁকুড়ার সোনামুখী। এই পৌরশহরে অগুন্তি কালীপুজো হয়, প্রতিটি কালীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেবীর মাহাত্ম্য। এখানে কালীপুজো চলে টানা পাঁচ দিন। শতাধিক বছরের পুরনো একাধিক পুজো রয়েছে এখানকার অলিগলিতে। তাই সোনামুখীকে কালীক্ষেত্র বললে খুব ভুল হবে না। সদ্য ঘুরে এলাম সোনামুখী থেকে। দেখে এলাম সেখানকার একাধিক জাগ্রত কালী মন্দির। সেসব কালী মাহাত্ম্যই শোনাব এই দীপান্বিতা বেলায়। 

সার্ভিস কালী

লালমাটির পৌর-শহর সোনামুখী ।একদিকে গভীর শাল পিয়ালের জঙ্গল, হাতির আনাগোনা, অন্যদিকে একের পর এক মন্দির। প্রত্যেকটির  ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য রয়েছে।এই অঞ্চলের স্বর্ণমুখী দেবীর মন্দির থেকে এলাকার নামকরণ হয় সোনামুখী। কুসুমকুমারী দেবী ও হরনাথ ঠাকুর এর জন্মস্থান হিসেবেও সোনামুখী বিখ্যাত। দেবী স্বর্ণমুখীকে সতীর এক অংশ রূপে ধরা হয়। চতুর্ভুজা দেবী, ঘোটক পৃষ্ঠে আরূঢ়া। শুধু কালী পুজো  নয় ,এখানে সাড়ম্বরে কার্তিক পুজোও হয় । 

তবে সোনামুখীর কালী বলতে প্রথমেই যাঁর কথা আসে তিনি 'মা-ই-ত মা'। কেন এমন অদ্ভুত নাম কালীর? কেনই বা সোনামুখী নামের প্রাচীন জনপদটি কালীর শহর হয়ে উঠল? 

হটনগর কালী

খোকা ঘুমলো পাড়া জুড়লো
বর্গীএলো দেশে।
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেবো কীসে?'

অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে র্বাংলার বুকে বর্গীরা হানা দিয়েছিল। কিন্তু 'বর্গী' কারা? শব্দটা এলো কোথা থেকে ? মারাঠি শব্দ 'বার্গির' থেকে এর উৎপত্তি ,যার অর্থ দ্রুতবেগে গতিশীল অশ্বারোহীর দল। সাত হাত লম্বা কম্বল ও বর্শা নিয়ে দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে ছুটে আসত বর্গীরা। সোনামুখীও বর্গী  হানায় আক্রান্ত হয়েছিল। সেই  সময়ে সোনামুখীতে আসেন মারাঠা সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত। মারাঠা সেনাপতি সদলবলে বিষ্ণুপুর থেকে সরাসরি সোনামুখীতে পৌঁছেছেন । এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন সোনামুখীর মানুষ ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়েন । দরজা-জানালা বন্ধ করে এক প্রকার গৃহবন্দী  হয়ে পড়েন সোনামুখীবাসী।

মাঁইত কালী মন্দির

বর্গীদের আসার খবরে যখন  ভয়ে কাঁপছে গোটা সোনামুখী তখন নিঝুম সন্ধেয় জঙ্গলাকীর্ণ পথে ভাস্কর পণ্ডিত দেখতে পান এক বৃদ্ধকে। হাড়িকাঠের সামনে পুজো করছিলেন বৃদ্ধ। লোকশ্রুতি, সেই বৃদ্ধকে মারতে খড়্গ তুলে ধরেন ভাস্কর পণ্ডিত। সঙ্গে সঙ্গে  দৃষ্টিশক্তি হারান ভাস্কর ।তাঁর মনে হতে লাগে উদ্যত খড়্গ যেন পিছন থেকে কেউ টানছে । ভাস্কর পণ্ডিত সেই সময় অত্যন্ত রাগত স্বরে বলেন, "কে আমার খড়্গ টেনে ধরেছিস?" বর্গীর দল উত্তর দিল, "না পিছন থেকে খড়্গ তো কেউ টেনে নেই" । তবু খাঁড়া বৃদ্ধের দিকে এগোয় না। দৃষ্টিহীন ভাস্কর ছটফট করতে থাকেন।

এরপর ওই বৃদ্ধকে মন্দিরের ঘটের জল ছিটিয়ে ভাস্কর পণ্ডিতের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনেন। অনুতপ্ত ভাস্কর পণ্ডিত বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করেন "এখানে কি কোনও দেবতা আছেন?" বৃদ্ধ উত্তর দেন, "হ্যাঁ, পর্ণকুটিরে মা কালী আছেন ।" তখন ভাস্কর পণ্ডিত চিৎকার করে ওঠেন ‘মা-ই-তো কালী’। সেই থেকেই এই কালী প্রতিমার নাম হয়ে যায় ‘মা-ই-তো কালী ‘। মারাঠী ভাস্কর পণ্ডিতের অবাঙালি উচ্চারণেই হয়ে যায় কালীর নাম। ভাস্কর নাকি খড়্গ রেখে যান মায়ের চরণে। ধীরেধীরে পর্ণকুটির রূপ নেয়  মন্দিরের । বিশাল কাঠামোর উপর মাটি দিয়ে প্রতি কালীপুজোয় তৈরি হয় বিশালাকার কালী মূর্তি।

সোনামুখীবাসীর রক্ষামাতা হয়ে ওঠেন ‘মা-ই-তো কালী ‘। তবে এই মন্দিরে মায়ের নিত্যপুজো হয় কাঠামোতে, নেই কোন মূর্তি। কার্তিকেয় অমাবস্যায় কালীপুজোর সময়ই ঐ কাঠামোতে মাটির প্রলেপে জীবন্ত হয়ে ওঠেন ‘মা-ই-তো মা'। বর্গীদের বহু নিদর্শন এখনও মন্দিরে রয়েছে। মায়ের পুজোয় রোজ একাধিক ছাগল বলি প্রদত্ত হয়। 

এমন  অনেক কালী মাহাত্ম্য জড়িয়ে রয়েছে  সোনামুখীর আনাচে-কানাচে। যেমন আরেকটু এগোলেই হটনগর কালী। সাড়ে চারশো বছর আগে সোনামুখী ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। জঙ্গলের অনেকটাই  আজও রয়েছে যা ফরেস্ট বিভাগের অধীনে।

পায়রা কালী

বহু বছর আগে সোনামুখীর গরীব বৃদ্ধা তারিণী সূত্রধর প্রতিদিন জঙ্গল পথে হেঁটে মাথায় ঝুড়িতে করে বড়জোড়ার নিরশা গ্রামে চিঁড়ে বিক্রি করতে যেতেন । বিনিময় প্রথায় সেই চিঁড়ে বিক্রি করে পাওয়া ধান নিয়ে তিনি আবার পায়ে হেঁটেই সোনামুখী ফিরে আসতেন । যাওয়া-আসার পথে পড়ত একটি খাল । বৃদ্ধা তারিণী সেই খালের পাশে খানিক বিশ্রাম নিয়ে সঙ্গে থাকা চিঁড়ে মুড়ি খেতেন । সেখানে প্রায় দিনই লাল পাড় শাড়ি পরা এক ছোট্ট শ্যামাঙ্গী মেয়ে তাঁর সঙ্গে সোনামুখী আসার জন্য বায়না করত ।

শেষে একদিন বালিকা জেদ ধরে বসল বৃদ্ধার সঙ্গে সে সোনামুখী যাবেই । তখন নিরুপায় তারিণী তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে সম্মত হন । কিছু দূর গিয়ে ওই ছোট্ট মেয়েটি বলে আমি আর হাঁটতে পারছি না । আমাকে কোলে নাও । কিন্তু মাথায় আর কোলে ধানের ঝুড়ি আর বস্তা থাকায় বৃদ্ধা তাঁর অসহায়তার কথা বললে, ওই শ্যামাঙ্গী এক রত্তি মেয়ে তাঁর মাথার ঝুড়িতেই চাপার কথা বলে । নিরুপায় তারিণী সূত্রধর তাই করেন। পরে তিনি বাড়ি ফিরে দেখেন ওই মেয়ে তো নেই। তার বদলে রয়েছে দু'টি পাথর । ভয় পেয়ে তিনি সেই পাথর দু'টিকে তুলসীতলায় রেখে দেন । সেদিন রাত্রেই বৃদ্ধা তারিণী মা কালীর স্বপ্নাদেশ পান, সেই শ্যামাঙ্গী ছোট্ট মেয়েটি তাকে বলছে, "আমার পুজোর ব্যবস্থা কর। পাড়ার আকড় গাছের নিচে আমাকে রেখে আয় । আমি মা কালী, তোর ভার বইতে যাতে কোন কষ্ট না হয় তাই এই পাথর রূপে এসেছি ।" ভয় পেয়ে পর দিন সকালে ওই বৃদ্ধা সোনামুখীর মানুষদের সব কথা জানান । নীচু জাতের বৃদ্ধার পাওয়া পাথর পুরোহিত পুজো করতে রাজি হন না। এরপর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন ঐ পুরোহিত । পরে তিনিও স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই পুজো করতে রাজি হন। এই পাথর থেকে তৈরি  মাকেই বলা হয় হটনগর কালী। সেই পাথর আকড় গাছের তলায় আজও আছে মন্দিরের পাশে। হটনগর কালীর নামকরণ নিয়ে এলাকায় মতভেদ রয়েছে । কেউ কেউ বলেন, হট যোগে কোন এক যোগী এখানেই সিদ্ধিলাভ করেন । তাই এরূপ নামকরণ । আবার কেউ কেউ বলেন, মা কালী হঠাৎ নগরে এসে ছিলেন । তাই হটনগর কালী নামকরণ হয়েছে। 

মাই তো মা

সোনামুখীর ছেলেদের চাকরি হচ্ছিল না। তাঁরা সবাই কালীর পুজো শুরু করায় একে একে সবার চাকরি লাভ ঘটে। সেই থেকে শুরু হয় 'সার্ভিস কালী' পুজো। 

সোনামুখীর ধর্মতলায় রায়বাড়ির ‘ক্ষ্যাপা কালী’ শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে। মা কালী নাকি বালিকা রূপ ধারণ করে রায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে মূর্তি। 

পায়রা কালীর পুজোতে নাকি একাধিক পায়রা বলি দেওয়া হত। সেই প্রথা অনেকদিনই বিলুপ্ত। কিন্তু পায়রা কালী নামটা থেকে গেছে। ওই এলাকাতেই মুখোপাধ্যায় বাড়ির দেবী গহনাদেবী নামে প্রসিদ্ধ। এককালে দেবী সালঙ্করা থাকতেন সোনার গয়নায়। 

এই কাঠামোতে তৈরি হন মা কালী

এছাড়াও সোনামুখীতে কালী পুজোর সময় থাকেন রক্ষা কালী, চামুণ্ডা কালী, ক্ষ্যাপা কালী, পাগলা কালী, দক্ষিণ খন্ড কালী, কৃষ্ণ কালী, সত্য কালী, নব মধ্যম কালী, এলোকেশী কালী, মধুশিব, ভদ্র কালী, বড় কালী, রথীন নগর কালী, থান্দারকালী রথতলা। 

বিসর্জনেও থাকে চমক। সোনামুখীতে গঙ্গার পাঠ নেই। তাই একাধিক পুকুর দীঘিতেই মায়েদের নিরঞ্জন হয়। তবে কোন পুকুরে কোন প্রতিমা কখন বিসর্জন হবে তার তালিকা প্রকাশ করা হয় শহরে। সব প্রতিমার শোভাযাত্রার পর জড়ো হন চৌমাথার মোড়ে। দশের পুকুর,শালী নদী,কেউট পুকুর,রানির বাঁধ, কুর পুকুরে সকাল আটটা থেকে রাত ১০ টা পেরিয়ে প্রতিমা নিরঞ্জন হয়। সেও যেন এক দেখার মতো উৎসব। 

হটনগর কালীর সেই শিলা পাথর

সোনামুখীর কালীকথার ইতিহাস মুখে মুখেই প্রচারিত। হাজার ভক্তের ঢল নামলেও কলকাতা বাসীদের কাছে এই অঞ্চলের পুজোর ইতিহাস অনেকটাই অজানা রয়ে গেছে আজও। কজন জানেন এই পৌর-শহরে মা কালীর পুজো  এমন সাড়ম্বরে পালিত হয়! আলোর উৎসবে সোনামুখীর কালীকথা জ্বলজ্বল করুক পাঠকদের মনে।


```