সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হল, এই ৪৫ জনের মধ্যে ২৭ জনই ছিলেন ‘রেফার্ড কেস’। অর্থাৎ, তাঁদের অন্য হাসপাতাল বা নার্সিংহোম থেকে সংকটজনক অবস্থায় মেডিকেলে পাঠানো হয়েছিল।

প্রতীকী ছবি।
শেষ আপডেট: 14 January 2026 19:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজ্যে মাতৃমৃত্যুর হার কমানো নিয়ে স্বাস্থ্য দফতরের (Health Department) উদ্বেগের শেষ নেই। একের পর এক বৈঠক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তলব, এমনকি শোকজ—সবই হয়েছে। তবু বাস্তব চিত্র বদলায়নি বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম সরকারি মেডিকেল কলেজ, কলকাতা মেডিকেল কলেজের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান (Kolkata Medical College)।
সেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মাতৃমৃত্যুর (Maternal Mortality) প্রধান কারণই হল দেরিতে (Late referrals) এবং সংকটজনক অবস্থায় (Critical Condition) রেফার।
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর, এই ১১ মাসে কলকাতা মেডিকেল কলেজে সাড়ে ৯ হাজারেরও বেশি প্রসব হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪৫ জন প্রসূতির। ডিসেম্বর মাসে আরও এক জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হল, এই ৪৫ জনের মধ্যে ২৭ জনই ছিলেন ‘রেফার্ড কেস’। অর্থাৎ, তাঁদের অন্য হাসপাতাল বা নার্সিংহোম থেকে সংকটজনক অবস্থায় মেডিকেলে পাঠানো হয়েছিল।
এই ২৭ জনের মধ্যে ২১ জনকে পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ থেকে। বাকি ৬ জন এসেছেন বেসরকারি হাসপাতাল থেকে। এর মধ্যে আবার দু’জনের ক্ষেত্রে ছোট নার্সিংহোমে গর্ভপাত করানোর পর গুরুতর জটিলতা দেখা দেয়। মরণাপন্ন অবস্থায় তাঁদের মেডিকেলে পাঠানো হয়। আরও এক জন প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে অ্যান্টিনেটাল পর্যায়েই—তাঁকেও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে রেফার করা হয়েছিল। অন্যদিকে, সরাসরি কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ১৮ জন প্রসূতির।
মেডিকেলের ‘মেটারনাল ডেথ রিলেটেড ডেটা ফর্ম’-এ উঠে এসেছে আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। দেখা যাচ্ছে, মৃত ৪৫ জন মায়ের মধ্যে ২৭ জনের সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়েছিল। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১৪ জনের হয়েছিল নর্মাল ডেলিভারি। মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সেপটিসেমিয়া বা রক্তের মারাত্মক সংক্রমণ। এই কারণেই মৃত্যু হয়েছে সর্বাধিক, ১৪ জনের। এ ছাড়া ‘প্রেগনেন্সি ইনডিউজড হাইপারটেনশন’ এবং প্রসবের আগে বা পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (পিপিএইচ)-এর কারণেও মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫ জনের।
কেন এত মৃত্যু? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসকের বক্তব্য, সমস্যা রেফার ব্যবস্থাতেই। গুরুতর রোগীকে বড় হাসপাতালে পাঠানো স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই হয় অপ্রয়োজনীয় রেফার হচ্ছে, নয়তো দেরিতে রেফার করা হচ্ছে, যখন পরিস্থিতি প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
যদিও মেডিকেলের একাংশ চিকিৎসক মানতে চান না যে লোকবলের ঘাটতি এই সমস্যাকে বাড়াচ্ছে। বাস্তব চিত্র বলছে, স্ত্রীরোগ বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের অনুমোদিত পদ ৮টি হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। সহযোগী অধ্যাপক থাকার কথা ৭ জন, আছেন ৪ জন। অধ্যাপকের পদ ৬টি, আছেন বিভাগীয় প্রধান-সহ ৪ জন। রাতে বহু দিনই সহকারী অধ্যাপক না থাকায় আরএমওদেরই দায়িত্ব সামলাতে হয়। স্বাস্থ্য প্রশাসনের একাংশের মতে, এই বাস্তবতার সঙ্গেই রেফার ব্যবস্থার গলদ মিলেমিশে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।