দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুম্বইয়ের ধারাভি বস্তিতে একের পর এক করোনা আক্রান্তের খোঁজ মিলছে। আর সেই সঙ্গেই সংশয় তৈরি হচ্ছে, ধারাভি কি আদতে টাইম বম্ব হয়ে উঠছে এদেশের করোনাভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম হটস্পট হিসেবে?
করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পরে একেবারে প্রথম ক'দিন একটু হলেও আলগা ছিল অনুশাসন। হয়তো আন্দাজ করা যায়নি পরিস্থিতি খারাপ হবে ক্রমশ। মার্চ মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হয় সাবধানতা। বারবার করে বলা হয়, দেশে যেভাবে করোনা সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করেছে, তাতে সামাজিক সংক্রমণ শুরু হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা। সেটা এড়ানোর অন্যতম উপায় সামাজিক দূরত্ব। সেই দূরত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই গোটা দেশ লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনও জটলা করা বারণ করা হয়েছে।

কিন্তু লকডাউন বা সামাজিক দূরত্বের তত্ত্ব ভেঙেচুরে খানখান হয়ে গেছে এই ধারাভিতে।
হবে নাই বা কেন? গোটা এশিয়ার বৃহত্তম বস্তি হিসেবেই পরিচিত মুম্বইয়ের ধারাভি। মাত্র দুই বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত অজস্র ছোট ছোট ঘরে বাস করেন সাত লক্ষেরও বেশি মানুষ। রয়েছে একতলা ও বহুতল ঘর, অজস্র সরু গলি ও কমন টয়লেট। সব মিলিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা একরকম অসম্ভব ব্যাপার।
সেইসঙ্গেই এখানে রয়েছে ছোট ও মাঝারি কয়েকটি গার্মেন্ট, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ, জুয়েলারি কারখানা। এগুলোতে কাজ করেন মূলত অভিবাসী শ্রমিকরা, যারা বাস করেনও একই এলাকাতে। আচমকা লকডাউনের কারণে বস্তির অনেক বাসিন্দারই এমন সঞ্চয় নেই, যা দিয়ে দিনযাপন করতে পারেন। অন্য কোথাও চলে যাওয়া তো দূরের কথা। সরকারি সহযোগিতার দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।

শুধু তাই নয়, মুম্বইয়ের স্বাস্থ্য দফতরের তথ্যই বলছে, এই বস্তিটিতে অনেক টিবি রোগী রয়েছেন। প্রত্যেক মরসুমে এখানে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় নিয়ম করে। সেখানে করোনাভাইরাসের মতো এত ছোঁয়াচে একটি সংক্রমণ থেকে কী করে মানুষ রক্ষা পাবে, তা নিয়ে অনেকেই কার্যত হতাশ। অনেকেই সন্দেহ করছেন, সংক্রমণ চারিয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। পর্যাপ্ত টেস্ট হচ্ছে না বলে হয়তো ধরা পড়ছে না।
যদিও স্থানীয় ওয়ার্ডের কাউন্সিল চেয়ারম্যান বসন্ত নাকাশে বলেন, ধারাভিতে যত জন আক্রান্তের খোঁজ পাওয়া গেছে, তাঁদের সকলেরই বাড়ি বস্তির একপাশে। মাঝামাঝি নয়। যদিও এই যুক্তি মেনে সংক্রমণ ছড়াবে না, এমন তত্ত্ব মোটেও স্বীকার করছেন না বিশেষজ্ঞরা। চেয়ারম্যানের আরও দাবি, সবরকম পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্যানিটাইজার স্প্রে করা হচ্ছে। কিন্তু এখানকার মানুষ লকডাউনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে না। অনেকেই ঘোরাঘুরি করছেন।

ধারাভিতে বহু বছর ধরে সেবার কাজ করছেন বেসরকারি চিকিৎসক ডঃ বিকাশ অসওয়াল। তিনি বলেন, করোনার বিস্তার যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে ধারাভি টাইমবোমা হয়ে ওঠা সময়ের অপেক্ষা কেবল। কারণ খুব কম করেও ১৪ দিনের আগে অসুখের লক্ষণ দেখা যাবে না। আর এই সময়টায় যে অসুখ আরও কত গভীরে ছড়িয়ে পড়বে, তা কেউ জানে না। তাই এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ শৃঙ্খলার সঙ্গে লকডাউন মেনে চলা উচিত।
ইতিমধ্যেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম এই বস্তির এক বাসিন্দার। বুধবার সন্ধ্যায় প্রথম করোনা আক্রান্তের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল ধারাভিতে। ঘণ্টা খানেক পরেই মৃত্যু হয় বছর ৫৬-র ওই প্রৌঢ়ের। এই ব্যক্তির বিদেশ সফরের কোনও খবর ছিল না সাম্প্রতিক সময়ে।

এর পরে বৃহস্পতিবার জানা যায় ধারাভিতে আরও একজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বছর ৫২-র ওই ব্যক্তি ছিলেন বৃহন্মুম্বই পুরসভার সাফাইকর্মী। আদতে ওরলির বাসিন্দা এই ব্যক্তির পোস্টিং ছিল ধারাভিতে। শুক্রবার বছর ৩৫-এর এক ডাক্তারের শরীরে পাওয়া গিয়েছে সংক্রমণের নমুনা। মুম্বইয়ের ধারাভির এই ডাক্তারকে এখন কোয়ায়রেন্টাইনে রাখা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কে কে তাঁর সংস্পর্শে এসেছিলেন তাঁদের খোঁজ শুরু হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ধারাভিকে করোনা সমক্রমণের সম্ভাব্য হটস্পট বলেই চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। গায়ে গায়ে ঘেঁষে থাকা সারসার বাড়ি এবং কমন টয়লেট ব্যবস্থায় সংক্রমণ এড়ানো কার্যত অসম্ভব। যদিও সরকারি ভাবে স্যানিটাইজ়ার স্প্রে করা হচ্ছে, মানুষদের সচেতন করার চেষ্টাও করা হচ্ছে, কিন্তু তার পরেও পরিস্থিতিকে আশাপ্রদ বলা যাচ্ছে না কোনও ভাবেই।