
শেষ আপডেট: 10 April 2023 10:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি সন্ন্যাসীশ্রেষ্ঠ। তাঁকে বলা হয় বোধিসত্ব অবলোকিতেশ্বরের অবতার। তিনি ভুল করতেই পারেন না। এক শিশুর সঙ্গে অশালীন আচরণের তো প্রশ্নই ওঠে না। বৌদ্ধ ধর্মগুরু ও তিব্বতের আধ্যাত্মিক প্রধান দলাই লামাকে (Dalai Lama) নিয়ে এমনটাই জানালেন লামা কর্মা জ্ঞান বজ্র রেপা। লেখনীর জন্য জনপ্রিয় লামাজি। 'লামার ঝোলা', 'অন্তঃরণ' 'আচার্য অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বিরচিত একাদশ গ্রন্থ' ইত্যাদি তাঁর অসংখ্য বই আছে।
রবিবার বৌদ্ধ ধর্মগুরুকে আচমকাই বিতর্ক শুরু হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওকে নিয়েই হইচই হয়। সেই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা যায়নি। তবে ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে উপস্থিত দলাই লামাকে প্রণাম জানাতে এসেছিলএকটি ছোট ছেলে। বয়স ৬-৭ বছর হবে। তাতে দেখা গেছে, বৌদ্ধ ধর্মগুরুর সামনে মাথা নোয়ানো ছেলেটির চিবুক ধরে তাঁর ঠোঁটে চুম্বন করছেন তিনি। তার পরে তিনি নিজের জিভটি বের করে এনে ওই কিশোরকে বলেন তাঁর জিভটি চুষে নিতে। ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘‘তুমি কি আমার জিভটি চুষে দিতে পারবে?’’ ছেলেটির জিভ স্পর্শ করতেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এই ভিডিও ঘিরেই দুনিয়াজুড়ে হইচই শুরু হয়। কেন দলাই লামা এমন করলেন তার কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি কেউ। এমনকী তাঁকে সরাসরি ‘পেডোফিল’ বলে বসেন অনেকে। বিতর্কে ইতি টানতে ক্ষমাও চেয়েছেন আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু।
এই বিষয়টা নিয়ে লামাজি কর্মা জ্ঞান বজ্র রেপাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, দলাই লামা এমন অনেক পরীক্ষা করেন যেগুলো আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একে খারাপ বললে মহাপাপ হবে। বৌদ্ধধর্ম জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী। লামাজি বলছেন, দলাই লামা যদি বাচ্চাটিকে কিছু করতে বলেন তাহলে এর সঙ্গে ছেলেটির পূর্বজন্মের কোনও সম্পর্ক আছে। হতেই পারে সেই ছেলেটি তার গত জন্মে গুরুকূলের কেউ ছিলেন। জিভের গঠন ও চিহ্ন দেখে সেটা বোঝা সম্ভব। দলাই লামার মতো আধ্যাত্মিক প্রধানরা তা বুঝতে পারেন।
এই প্রসঙ্গে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন লামাজি। তিনি বলছেন, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন যে প্রতিজন দালাই লামাই পূর্ববর্তী দালাই লামার পূনর্জন্ম। বা তিব্বতিদের ভাষায় 'করুণাময় বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বরের অবতার'৷ একজন দালাই লামা মারা গেলে, বৌদ্ধ সাধকেরা তার পুনর্জন্মিত অবতারের সন্ধান শুরু করেন। সাধারণত একটি অল্প বয়স্ক ছেলের মধ্যে এই আত্মার আত্মপ্রকাশ ঘটে, যাকে পূর্ববর্তী শাসকের ক্রমধারা রক্ষার্থে ও দালাই লামার প্রশিক্ষণের জন্য প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। এরমকই একবার হয়েছিল বহু বছর আগে। এখনকার দলাই লামা এক শিশুর মধ্যে তাঁর গুরু রিম্পোচেকে দেখেছিলেন। শিশুটিকে কয়েকটি লজেন্স দিয়েছিলেন দলাই লামা। বাচ্চাটি লজেন্স হাতে নেয় কিন্তু সেটা না খেয়ে হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। বাচ্চাটি মাথা নীচের দিকে নোয়ানো ছিল। এরকম হাবভাব ধর্মগুরু রিম্পোচেরই ছিল। শিশুটিকে দেখে দলাই লামা বুঝতে পারেন বাচ্চাটি ছিল তাঁর গুরু রিম্পোচের পুনর্জন্ম। শিশুটিকে তিনি প্রণাম করেছিলেন।
মানুষ দুঃখকে কোন দৃষ্টিতে দেখে আর তার নিবারণের জন্য কী কী করে, তার ভিত্তিতে আচার্য অতীশ দীপঙ্কর মানুষকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছিলেন। জীবনের প্রতি, ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেও অতীশ দীপঙ্করের এই শ্রেণিবিভাগ। তিনি বলেছিলেন, সর্বকল্যাণকামী এক হৃদয় হল ‘বোধিচিত্ত’ পরে তিনি এই বোধিচিত্তকেও দু’ভাগে ভাগ করেছিলেন: ঊর্ধ্বমুখী (aspiring) বোধিচিত্ত ও নিবিষ্ট (engaging) বোধিচিত্ত। বুদ্ধের পথের পথিককে ‘বোধিপথপ্রদীপ’ প্রথমে পথ দেখায় দুটি স্তরের মধ্য দিয়ে। কেউ হয়তো এ জন্মের তুলনায় আরও ভাল এক পুনর্জন্মের প্রত্যাশী। আবার কেউ চান আত্মমুক্তি।
লামাজি বলছেন, জিভের গঠন, রঙ ও জিভে থাকা বিশেষ চিহ্ন (যা বৌদ্ধ সাধকরাই বুঝতে পারে) দেখে জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম বিষয়ে জানা যায়। প্রত্যেক মানুষের জিভের গঠন ও রঙ আলাদা। কে কোন গুণের অধিকারী ও কার পুনর্জন্ম হয়েছে তা জিভের গঠন ও রঙ দেখেও বলা যায়। বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা তা পারেন। জিভের বিশেষ চিহ্ন দেখেও অনেক পরীক্ষা করা হয়। লামাজির কথায়, এমন অনেক পরীক্ষা আছে যা খোলা চোখে দেখলে খারাপ বা অশ্লীল মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তা মানুষের হিতের জন্যই। কর্মফল, জন্মান্তর, পুনর্জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। দলাই লামাজিও হয়ত তেমনই এক পরীক্ষা করেছিলেন। এতে অশ্লীলতা বা শিশুটির প্রতি নিগ্রহের কোনও কারণই ঘটেনি। তাই সবটা না জেনে এবং বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ় বিষয়গুলোকে না বুঝে, এই ঘটনাকে খারাপ চোখে দেখার কোনও মানে হয় না।