লা নিনার (La Niña) প্রভাবে কলকাতা-সহ বাংলায় বেনজির শীত। পারদ ১০ ডিগ্রির ঘরে, শৈত্যপ্রবাহ, স্কুল ছুটি নিয়ে জল্পনা।

লা নিনার প্রভাবে জাঁকিয়ে শীত।
শেষ আপডেট: 6 January 2026 14:52
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শীত (Winter) যে এ বার অন্য রকম হবে, সেই ইঙ্গিত অনেক আগেই দিয়েছিল মৌসম ভবন (Weather Update)। তাতে সিলমোহর দিয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারও (Climate Centre)। বছরের শেষ দিকে শুরু হওয়া শক্তিশালী ‘লা নিনা’ (La Niña) যে ভারতের আবহাওয়ার (India Winter) ছবি ওলটপালট করে দিতে পারে, সেই সতর্কতা ছিল স্পষ্ট। ডিসেম্বরের শেষ এবং জানুয়ারির শুরুতেই তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলল বাংলায় (West Bengal)। কলকাতার পারদ নেমে এল ১০ ডিগ্রির কাছাকাছি (Kolkata Coldest Day), শহর-শহরতলি থেকে গ্রাম—হু হু করে কাঁপছে গোটা রাজ্য (Kolkata Weather Update)। আবহবিদদের কথায়, কার্যত শৈত্যপ্রবাহের (Cold Wave) পরিস্থিতি, যা কলকাতার ক্ষেত্রে প্রায় নজিরবিহীন।
বিশ্বের আবহাওয়ার বড় ছবিটা নির্ভর করে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রার উপর। ওই মহাসাগরের উপরের স্তরের জল স্বাভাবিকের তুলনায় ঠান্ডা হয়ে গেলে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাকেই বলা হয় লা নিনা। এর প্রভাবে একদিকে যেমন বৃষ্টি বাড়ে, তেমনই বিশ্বের বহু অঞ্চলে নেমে আসে কনকনে শীত। ঠিক তার উল্টো প্রক্রিয়াটি হল ‘এল নিনো’, যেখানে সমুদ্রের জল উষ্ণ হয়ে ওঠে এবং তার জেরে তাপপ্রবাহ, অনাবৃষ্টি বাড়ে।
এ বছর আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা ছিল, এই লা নিনা আগের কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। বাস্তবেও তাই হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে শক্তিশালী শীতল বায়ুপ্রবাহ তৈরি করেছে, যাকে জেট স্ট্রিম বলা হয়। ভারতের ক্ষেত্রে এই জেট স্ট্রিম উত্তর ভারত হয়ে বইবে বলেই পূর্বাভাস ছিল—আর তারই প্রভাব এসে পড়েছে পূর্ব ভারতে, কলকাতা-সহ বাংলায়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)-র সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, লা নিনার প্রভাবে এ বছর উত্তর ভারতের শীত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যাও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু ভারত নয়—চিন, কোরিয়ার মতো দেশেও কনকনে ঠান্ডার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই অঞ্চল থেকে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে দক্ষিণ এশিয়ার তাপমাত্রা আরও নামিয়ে দিতে পারে। এই প্রভাব আগামী তিন মাস পর্যন্ত থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
আবহবিদদের ব্যাখ্যায়, এল নিনো-লা নিনা আসলে ENSO (El Niño Southern Oscillation) নামের একটি বৃহৎ সমুদ্র-বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়ার অংশ। সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৭ বছরে একবার এই চক্র বদলায়—কখনও উষ্ণ (এল নিনো), কখনও শীতল (লা নিনা), আবার কখনও নিরপেক্ষ অবস্থা দেখা যায়। তবে এ বছর সেই চক্র অনেক বেশি আক্রমণাত্মক।
মঙ্গলবার সকালে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে দাঁড়ায় প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে—স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩.৭ ডিগ্রি কম। দমদমে পারদ নেমেছে ৯ ডিগ্রির ঘরে। সল্টলেক, ডায়মন্ডহারবার, দিঘা—সব জায়গাতেই শীতের থাবা স্পষ্ট।
জেলাগুলির চিত্র আরও ভয় ধরাচ্ছে। আসানসোল: ৮.৮ ডিগ্রি। বাঁকুড়া: ৭.৮ ডিগ্রি। মালদহ: ৯.৭ ডিগ্রি। আর সবচেয়ে ঠান্ডা শ্রীনিকেতন—মাত্র ৬.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দার্জিলিঙে পারদ নেমেছে ৩ ডিগ্রির আশপাশে, কোচবিহার-জলপাইগুড়িতেও শীত জাঁকিয়ে বসেছে। পাহাড়ে পর্যটকদের ভিড় বাড়লেও সমতলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে।
আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষায়, কোনও অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নীচে নামলে এবং দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ৪.৫ ডিগ্রি কম থাকলে তাকে ‘শীতল দিন’ বলা হয়। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ৪.৫ ডিগ্রি বা তার বেশি কমে গেলে সেটাই শৈত্যপ্রবাহ। চলতি পরিস্থিতিতে বহু জায়গাতেই এই দুই অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে পারদ।
এই বেনজির শীত সবচেয়ে বেশি চিন্তা বাড়াচ্ছে শিশুদের নিয়ে। বড়দিনের ছুটি শেষ হতেই শুরু হয়েছে স্কুল, অনেক জায়গায় মর্নিং স্কুল। কিন্তু এমন ঠান্ডায় সকালবেলা স্কুলে যাওয়া শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে বলে মত অভিভাবকদের। নবান্ন সূত্রে খবর, আলিপুর আবহাওয়া দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী এই সপ্তাহজুড়েই শৈত্যপ্রবাহ চলতে পারে। সেই কারণেই স্কুল ছুটি বা সময় পরিবর্তন নিয়ে রাজ্য সরকারের অন্দরে আলোচনা চলছে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস—আগামী কয়েক দিন শীতের দাপট একই রকম থাকবে। কুয়াশা আরও ঘন হবে, ভোরের দিকে দৃশ্যমানতা কমবে। উত্তরবঙ্গের কিছু জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সংক্রান্তির আগে শীত কমার কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট—এ শুধু সাধারণ শীত নয়। লা নিনার জেরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি বাংলার আবহাওয়ার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় হয়ে থাকতেই পারে।