
শেষ আপডেট: 4 November 2023 23:48
বধিরতা বাড়ছে। কানের সমস্যা প্রাপ্তবয়স্কদের শুধু নয়, শিশুদের মধ্যেও বেড়ে চলেছে। জন্মগত ত্রুটি, জটিল রোগ, সংক্রমণ জনিত রোগ, শব্দদূষণ থেকে লাইফস্টাইল ডিজিজ—এর ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখে রীতিমতো উদ্বেগে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কারণ মহানগরও জর্জরিত শব্দ দূষণে। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রক বোর্ড ও পরিবেশ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে শব্দের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বায়ু দূষণের পাশাপাশি শব্দ দূষণের তাণ্ডবেও নাজেহাল অবস্থা। অফিস টাইমে কলকাতার নানা জায়গা শব্দমাত্রা বিপদসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এমনকী স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল চত্বরেও শব্দমাত্রা নির্ধারিত মাত্রাকে অতিক্রম করে চলেছে।
বায়ুদূষণের মতোই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে শব্দদূষণ। এ প্রসঙ্গে প্রযুক্তি-পরিবেশবিদ সোমেন্দ্র মোহন ঘোষ বলছেন, “আজ শনিবার সকালেই ফোর্ট উইলিয়ামের কাছে শব্দমাত্রা মাপা হয়েছে যা অত্যধিক বেশি। বিশেষ করে অফিস টাইমে রবীন্দ্রসদন চত্বরে শব্দমাত্রা ৮০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ”
পরিবেশবিদ সোমেন্দ্র মোহনবাবু বলছেন, কলকাতার বায়ু দূষিত। এখনই বাতাসে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ২০০ ছাড়িয়েছে। তার মধ্যে শব্দদূষণও চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। পরিবেশবিদ বলছেন, দূষিত বায়ু মানে তার মধ্যে শুধু ধূলিকণা বা বিষাক্ত গ্য়াসের মাত্রা মাপা হয় না, টোটাল এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে বাতাসে থাকা শব্দ তরঙ্গও পরিমাপ করা হয়। তাতে দেখা গেছে, দূষিত বাতাসের কণার মধ্য়েই দিয়েই বিপজ্জনকভাবে বাহিত হচ্ছে শব্দ তরঙ্গও। দিনের বেলায় অফিস টাইমে এই তরঙ্গের মাত্রা সাঙ্ঘাতিক বেশি। এমনকী যেসব এলাকায় শব্দের মাত্রা কম রাখার কথা, সেখানেও তা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে।
পাড়ার ক্লাব হোক, উৎসব অনুষ্ঠান হোক, নাইট পার্টি থেকে জিম, ট্রাফিক--শব্দের দাপট মারাত্মক হয়ে উঠছে। তার উপর ইয়ারফোন, হেডফোনে তারস্বরে গান শুনছেন কমবয়সিরা। শব্দের মাত্রা সহনশীলতার বেড়া টপকে যাচ্ছে। কখনও শব্দের মাত্রা ৮৫ ডেসিবেলের বেশি, আবার কখনও এই শহরেই ১৪০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যাচ্ছে যা বিপজ্জনক।
সোমেন্দ্রবাবু বলছেন, পরিবেশ মন্ত্রকের তথ্যই জানাচ্ছে দিনে বা রাতে শিল্পক্ষেত্র বা বসতি, সব সময়ে এবং সর্বত্রই শব্দের দাপট অব্যাহত। বসতি এলাকার ক্ষেত্রে দিন ও রাতে শব্দমাত্রা ৮০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সাধারণ শব্দমাত্রা ৬৫ ডেসিবেলের বেশি হওয়া মানেই তাকে দূষণের আওতায় ফেলা হয়। শব্দমাত্রা ৭৫ ডেসিবেল ছাড়ানো মানেই তা ক্ষতিকর, আর যদি ১২০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যায় তাহলে তা বিপজ্জনক ও যন্ত্রণাদায়ক। ‘সাইলেন্স জ়োন’ এলাকায় নির্ধারিত শব্দমাত্রা (দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল) ধারাবাহিক ভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
যে কোনও উৎসবের সময়ে যাতে 'সাইলেন্স জ়োন' এ ১০০ মিটার এলাকার মধ্যে পরিবেশবান্ধব বাজিও না ফাটানো হয় সেই বিষয়ে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এক নির্দেশিকা জারি করেছে এবং আইন অমান্য করলে পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এখন দেখা যাচ্ছে, শুধু কালীপুজোয় নয়, বরং সারা বছর ধরেই শহরে দাপাচ্ছে এই শব্দ-ত্রাস। শব্দদূষণ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট, কলকাতা হাইকোর্ট, জাতীয় পরিবেশ আদালত বহুবার সতর্ক হতে বলেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার দেখা যাচ্ছে, কলকাতা হাইকোর্ট বা আলিপুর কোর্ট চত্বরেও শব্দমাত্রা নিয়মনীতি ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
মানুষের কান শব্দের ব্যাপারে যথেষ্ট সংবেদনশীল। তীব্র শব্দ কানের পর্দায় বেশ জোরে ধাক্কা দেয়, যা কানের পর্দাকে নষ্টও করে দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তাই তারস্বরে ডিজে বাজানো, মাইক ও লাউডস্পিকার চালানো বন্ধ করতে হবে।
আমরা মোটামুটি সবাই জানি, শব্দের পরিমাপ হল ডেসিবেল। ফিসফিসিয়ে আমরা যে কথা বলি, তাও মোটামুটি ২৫ ডেসিবেল। সেই হিসেবে ৭০- ৭৫ ডেসিবেল অবধি শব্দ কানের পক্ষে সহনীয়। ৯০ ডেসিবেল এর বেশি হলেই কানের মারাত্মক ক্ষতি হতে থাকে। তাই শব্দদানবকে বধ করার দায়িত্ব নিতে হবে শহরবাসীকেই।